25 C
Kolkata
Monday, December 5, 2022
More

    পরিচালক নিলয় মিত্রের স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘তুলির টানে’, একটি সম্পর্কের এপিটোম

    দ্য ক্যলকটা মিরর ব্যুরো: ঋতুপর্ণর ১৯’শে এপ্রিল ছবিটা কাল ফাইল ঘেঁটে বের করে আবার দেখলাম। আসলে ঋতুদা’কে মনে করিয়ে দিলেন পরিচালক নিলয় মিত্র। বাংলা সমান্তরাল ছবির একটা গোছানো অন্দরমহল ঘরানা তৈরি করে দিয়েছিলেন ঋতু দা। আর সেই ঘরাণাকেই আরও কয়েক মাইল বুস্ট করলেন পরিচালক নিলয়। তিনি বাদশা মৈত্র, মেঘনা হালদার আর শিশু শিল্পী রূপকথা মিত্র কে নিয়ে একটি নিটোল সম্পর্কের চড়াই উতরাই এঁকেছেন ছোট্ট ছবি ‘তুলির টানে’ তে।

    নিলয় এর এটি দ্বিতীয় ছবি। যত্ন, বোধ আর নিপুন দক্ষতায় ছবির প্রতিটা ফ্রেম বাঁধা। লেখার শুরুতেই ঋতুদা’র উপমা দিয়েছিলাম কারণ, অ্যাক্সিডেন্ট, মৃত্যু আর নি:সঙ্গতা এই ত্রয়ীর যে ডি রিগর (de rigueur) ওনার ছবিতে ছিল, সেই ধারাতেই নিলয় এক ছিপ নৌকা বেয়ে গিয়েছেন। আর পেছনে নেপথ্যে ব্যবহার করেছেন কখনো রবীন্দ্রনাথ আবার কখনো লোকগীতি। বাদশা মৈত্র’র চরিত্রটির নাম অর্জুন, রূপকথা’র নাম ‘তুলি’ আর একটি বিশেষ চরিত্রে ‘মল্লিকা’র নাম ভূমিকাতে মেঘনা হালদার। পরিচারিকার চরিত্রে প্রিয়দর্শিনী দাশগুপ্ত অনবদ্য। আর খুব স্বল্প চরিত্রে তুলির মাযের ভূমিকাতে প্রযোজক অর্পিতা মিত্র ভালো করেছেন।

    গল্পের শুরু যেভাবে হয়, অর্জুন, একটি করপোরেট উঁচু পদে কর্মরত, তাঁর স্ত্রী নিতাও ( অর্পিতা মিত্র) একটি বড় কম্পানিতে কাজ করতেন, তিনি হটাত্‍ পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। মেয়ে তুলি, যার বয়স ৭ তাকে দেখার কেউ নেই। অর্জুন ব্যক্তিগত আর অফিস দুই জীবনেই ভিশন ক্যাসুয়াল। সে একই টেবিলে বসে পরকীয়া করতে করতেই অধ:তন কলিগদের মান্থলি টার্গেট না পূরণ করা নিয়ে দুরমুশ করতে পারেন। অথচ এই মানুষটা তাঁর স্ত্রী, তাঁর সন্তান এই দুইয়ের মাঝে শুধু সেলফোন ছাড়া আর জীবনের কিছুই আনেন নি। নিতার প্রয়াণের পর, মেয়ে তুলি কে দেখার জন্যে ২৪ ঘন্টার পরিচারিকা রাখে অর্জুন। আর ঠিক এই সময় থেকেই তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট শুরু হয়।

    অর্জুনের অফিসের পরকীয়া সঙ্গী মল্লিকাকে তুলি খুব একটা পছন্দ করে না, অন্য দিকে মল্লিকাই অর্জুনের সব টুকু। এই দুই সম্পর্ক কে অর্জুন অনুভব করতে শুরু করে যখন তার হটাত্‍ করে কাজ চলে যায়। একদিকে যুবতী পরিচরিকা কে নিয়ে সমাজের তিল কে তাল করার অভ্যাস, মা হারা তুলির বাবা কে অন্যরকমভাবে আবিষ্কার আর অন্যদিকে মল্লিকার অমোঘ বন্য শরীরের নেশা। এই তিন নারী অর্জুনের জীবনে যেনো সাদা খাতা, তুলি আর রঙ। এর পর কিভাবে অর্জুন সম্পুর্ণ ছবিটা আঁকলো, সেই ছবির ক্যানভাসে শেষ মুখটা কার রইল, সেটা জানার জন্যেই ছবিটা দেখুন।

    বাদশা মৈত্রের অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই। ব্যক্তিত্ব, স্বর, অভিব্যক্তি কখনোই গল্প থেকে সরে গিয়ে এক পাও বাইরে ফেলেনি। বাবা, স্বামী, প্রেমিক আর বস এই সবকটা চরিত্রই বার করে নিয়েছে পরিচালক নিলয়। মল্লিকার চরিত্রে মেঘনা অনবদ্য। বিশেষ করে বলিষ্ঠ দৃশ্যে কোনো আরষ্ঠতা ছিল না। বাদশা’র সাথে তার ‘লিপলক’, বাংলা ছোট্ট ছবির নির্মাণে বিরল। তুলির টানে আর একজনের নাম না উল্লেখ করলেই নয়, তিনি হলেন শান্তনু সাহা। ছোট্ট কমিক রিলিফের জন্যে তাঁর অভিনয়, সাম্প্রতিক সময়ের ‘ভূতের ভবিষ্যতের; শাশ্বত’র অভিনয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু তাই নয় চুড়ান্ত সিরিয়াস মূহুর্তে তাঁর সহজ সরল চরিত্রের বাস্তবায়ন সত্যিই মনে রেখে দেয় তাঁকে।

    তুলি, নাম ভূমিকায় ছোট্ট রূপকথা একবারের জন্যেও বুঝতে দেয় নি যে সে অভিনয় করছে। বাদশার সাথে প্রতিটা দৃশ্যেই দারূন ভাবে বাবা-মেয়ের অনাবিল, ও নিটোল ভালোবাসার ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। এই ছোট্ট মেয়েটার ডায়ালগ থ্রোইং বলে দেয় সে অনেক দূরের যাত্রী।

    শিশু শিল্পী কে দিয়ে যে পরিচালক অভিনয় বার করে নিতে পারে তাঁর বুত্‍পত্তি নিয়ে নতুন কিছুই বলার নেই, সে ইটালিয়ান পরিচালক ভিত্তরীয় ডি সিকা, ইরানিয়ান পরিচালক মজীদ মাজিদিই হোক বা আমাদের সত্যজিত্‍ বাবু। নিলয় এর এই স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করাই বলে দেয় সে কতটা দক্ষ শিশু শিল্পীকে নিয়ে ছবি তৈরিতে।

    ছবিটি ফ্রেমে ধরেছেন শুভদীপ নস্কর। আলোর ব্যবহার বড় ফ্রেমের চলচ্চিত্রের মতই। ইনডোর আর আউটডোরের আলোর ব্যালেন্স খুব ভালো। শুধু হ্যাণ্ড হেল্ড শট গুলোতে আর ও একটু যত্নের প্রয়োজন ছিল।

    ছবিটিকে জুড়েছেন দুই অভিজ্ঞ সম্পাদক যথাক্রমে গৌতম হালদার ও প্রবুদ্ধ ঘোষ। জাম্প কাট, সিকয়েন্স কাটে খুব সুন্দরভাবে একটা নাটকীয়তা উপহার দিয়েছেন। তবে একজন কালারিস্ট এর অভাব লক্ষণীয়। আবহ সঙ্গীতে বিশ্বজিত কাঞ্জিলাল ও কন্ঠে পারমিতা সমাদ্দার অনেকদিন কানে লেগে থাকবে।

    সর্বশেষে আসি গল্প ও চিত্রনাট্যে। ছোট্ট ছবিতে গল্পের ব্যালেন্স করাটাই চ্যালেঞ্জের। একটা ২৫ মিনিটের ছবিতে একটা উপন্যাসের জিস্ট কে আটকে রাখা, হ্যাট্স অফ টু নিলয়। এই একটা ছবি দেখার পড়ে আরও ছবি, আরও নতুন সম্পর্কের গল্প ডিজিটাল মাধ্যমে দেখার ইচ্ছা রইল। এই ছবির একটা অংশ ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়ে যায়, যখন সদ্য মা হারানো তুলিকে ভোলানো নিয়ে বাকীদের রূপকথার গল্পের প্রতিবাদ করে বাদশা বলে ওঠে, “ওর সত্যিটা জানা উচিত, আমি চাইনা ও একটা ভুল আশা নিয়ে বড় হোক। মা আর কখনো ফিরে আসবে না তুলি।”

    এই ছবিটা নিলয় বিশেষ যত্নে বানিয়েছে সে জন্যে নয়, এই ছবিটা একটা মূল্যবোধের চোরা স্রোতকে মনে করিয়ে দেবে, সেই জন্যেই অবশ্যই দেখবার।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    নজিরবিহীন ঘটনা , অশোকনগরে বৃদ্ধ দম্পতির ঘরে জন্ম নিল ফুটফুটে সন্তান

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : স্বামীর বয়স প্রায় ৭০ বছর আর তার স্ত্রীর বয়সও পঞ্চাশের বেশি। বৃদ্ধ এই দম্পতির...

    বাজিমাত করল ভারতীয় অর্থনীতি , অনেক পিছিয়ে চীন

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ফের বাজিমাত করল ভারতীয় অর্থনীতি। সরকারি ভাবে প্রকাশিত হল চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় কোয়ার্টারের বৃদ্ধির...

    গুজরাটে ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে বিজেপি , উত্থান আপের ! বলছে বিভিন্ন রিপোর্ট

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করবে BJP। প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা রিপোর্ট জানাচ্ছে, দুই...

    রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর , বড়দিনে বাড়তি মিলবে ছুটি

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : বড়দিনে বড় আনন্দ। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিরাট সুখবর। ২৬ ডিসেম্বরও ছুটি পাবেন রাজ্য...

    বঙ্গে শক্তি প্রদর্শনে RSS ! লম্বা সফরে মোহন ভাগবত

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ৫ বছর পরে কলকাতায় প্রকাশ্য সমাবেশ করতে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। আগামী ২৩ জানুয়ারি...