16 C
Kolkata
Monday, January 17, 2022
More

    নয় মানব! নয় মানবী!! শুধুই কী কল্পনা? – জয়ন্ত কুমার সরকার।

    প্রথম পর্ব

    “ডেনিশ গার্ল” নামক ডেনমার্কের একটি সিনেমায় নায়িকা লিলি তাঁর প্রিয়তমকে বলেছিলেন, “God made me a woman. But the doctor…He…The doctor is curing me of the sickness that was my disguise.” (অর্থা‍ৎ লিলি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর তাঁকে মনোজগতে একজন নারী হিসেবেই তৈরি করেছেন; নয়তো নিজেকে নারী হিসেবে ভাবতে পছন্দ করবেন কেন! কোন এক অজানা কারণে তিনি নারীত্ব লাভে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় সেই ভুল থেকে পরিত্রাণ চান)। একটি বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে এইনার ওয়েগনার নামে ডেনমার্কের একটি ‘ছেলে’ লিঙ্গ পরিবর্তনের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে “জেন্ডার রি-অ্যাসাইনমেন্ট তথা লিঙ্গ পরিবর্তন”-এর জন্য অস্ত্রোপচারের সাহায্যে ‘মেয়ে’ হয়ে লিলি এলবে নাম নিয়েছিলেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যা অনন্যসাধারণ মাইলফলক। যদিও বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার নিবিড় মেলবন্ধনে তৈরি আমাদের সংস্কৃতি-কৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সর্বোপরি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণে এটা বাংলাদেশে শুধু অকল্পনীয়ই নয়, অসম্ভবও। তবে প্রযুক্তি নির্ভর তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিপ্লবের লক্ষণ স্পষ্ট। তাই স্বেচ্ছায় লিঙ্গ পরিবর্তন করে আকাঙ্ক্ষিত লিঙ্গ ধারণের বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন ভবিষ্যতে আসবে কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ। সুতরাং বিষয়টি অনাগত ভবিষ্যতের হাতে রেখে বর্তমান নিয়ে আলোচনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

    “হিজড়া বা বৃহন্নলা”। ছোট থেকে বুড়ো, পথে-ঘাটে-পাড়া-মহল্লায় তাঁদেরকে উৎসাহভরে (হোক সে শ্রদ্ধা, করুণা, উপহাস বা ঘৃণাভরে) দেখেনা এমন মানুষ পাওয়া ভার! কোন বাড়িতে নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করলে তাঁরা সেই নবজাতককে নিয়ে নাচ-গান-বাজনার মাধ্যমে সবাইকে আনন্দ দেন। কংক্রিটের শহরে এগুলো আলোড়িত না হলেও পাড়া-গাঁয়ে সংশ্লিষ্ট বাড়িকে ঘিরে থাকে আনন্দমুখর পরিবেশ, দেখতে ভিড় জমায় সব ধরণের মানুষ; হয় বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সেসব অভিজ্ঞতার সবই যে হিজড়াদের জন্য খুব সুখকর সেটা ভাবার সুযোগ নেই। তবে তাঁরা চলে যাওয়ার পর তাঁদের অঙ্গভঙ্গি নকল করে অন্যান্যদের আনন্দদায়ক কাজকর্ম আর মুখরোচক আলোচনা সারাটা দিন মাতিয়ে রাখে।

    হাস্যকর মনে হলেও প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত জীবনের একটি ঘটনা বলছি। ছোটবেলা থেকেই মায়ের অত্যন্ত কাছাকাছি থাকার সুযোগে গভীরভাবে দেখেছি তাঁর জীবনপ্রণালী। পেয়েছি সকলস্তরের মানুষকে সম্মান করার মতো চমৎকার সব শিক্ষা। হাতেখড়ি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বাইরে শুধু মা’ই ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু। ফলে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছেও যেতে হয়নি কখনও। কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পরই মা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় ‘গণিত’- এ সহযোগিতা করতে আমার ও মেজদি’র জন্য একজন শিক্ষক ঠিক করলেন। গ্রাম্য সুবাদে তাঁকে ফুফি বলতাম (ফুফির সামাজিক মর্যাদার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে নাম উল্লেখ করলাম না)। তিনি তখন স্নাতক শ্রেণিতে পড়তেন। লোকমুখে প্রচলিত উনি হিজড়া সম্প্রদায়ভুক্ত (গ্রামে হিজড়া আসার খবরে ফুফিকে ঘরে লুকিয়ে রাখলে সেটি আরো মুখরোচক হতো)। বিষয়টি মায়েরও জানা ছিল। আশেপাশে কয়েকজন শিক্ষক থাকতেও আমাদেরকে তাঁর কাছে পড়তে পাঠাতেন এবং প্রতিবেশীরা হাসি-ঠাট্টা করলে দুই ভাই-বোনকে চমৎকারভাবে বোঝাতেন, “লোকজনের কথা সত্য হলেও লজ্জার কিছু নেই, বরঞ্চ গৌরবের। পৃথিবীর সব মানুষই সমান মর্যাদার। অসৎ ও চরিত্রহীন ব্যক্তি ছাড়া সবার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। যিনি সুশিক্ষা দিতে পারেন তিনিই প্রকৃত শিক্ষক”। তাই আমার শৈশবের সেই শিক্ষক থেকে শুরু করে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে মনে কখনও খারাপ ধারণা আসেনি। এখন গর্ব হয়; শৈশবেই ভিন্ন শারীরিক গঠণের একজনের কাছে অল্প সময়ের জন্য হলেও আমার শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে (বিষয়টি জানার পর পরিচিত অনেকে উপহাস করলেও আমি বিচলিত নই)। আর স্বর্গীয় মায়ের প্রতি অতল শ্রদ্ধা গভীরতর হয়, কী অনন্যসাধারণ উদারতার অধিকারী ছিলেন তিনি!

    সময়ের বিবর্তনে এখন সব ক্ষেত্রেই ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সমাজ ব্যবস্থাপনা, আচার-আচরণ, মানসিকতা সবকিছুতেই পেশাদার মনোভাব। আগেকার দিনে হিজড়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল প্রায় সকল মানুষই। বর্তমানে তাঁদের কারণে সাধারণ জনগণ অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিরূপ। কিন্তু জনসাধারণের বিড়ম্বনার পথ হিজড়াদের কেনইবা বেছে নিতে হয়? বর্তমানে যান্ত্রিকপ্রায় সমাজের সেটা ভাবার সময়ইবা কোথায়? তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তাঁরা অবহেলা, অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, উপহাস এমনকি নির্মম প্রহারেরও শিকার। এখনও সমাজ-রাষ্ট্রের কোথাও তাঁদের জন্য সম্মানজনক জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয়ে আত্মসম্মান বজায় রেখে শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা নেই। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ভুক্তভোগী পিতা-মাতা হিজড়া সন্তানকে সমাজে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদারতা দেখাতে সঙ্কোচবোধ করেন। পাশাপাশি সমাজ কারো ‘হিজড়া’ পরিচয় জানার পর ঐ পরিবার বা ব্যক্তিকে আপন করে নেওয়ার ‌উদারতা দেখাতে দারুণভাবে ব্যর্থ। ফলে মানসিক হীনমন্যতা, আড়ষ্ঠতা, লোকলজ্জা, দুঃখ, সর্বোপরি সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়ে ঐ সন্তানকে যেতে হয় কথিত ‘গুরু মা’-এর আশ্রয়ে। আয়ত্ত্ব করতে হয় নাচ-গান-বাজনা-হাততালি এবং কড়া প্রসাধনী মেখে অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সাধারণের মনোরঞ্জনের কলাকৌশল; বেছে নিতে হয় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি জীবনধারা। যার অনিবার্য পরিণতি ভয়ঙ্কর রকমের সামাজিক বিড়ম্বনা, শিকার আমরাই।

    হিজড়াদের সামাজিক বিড়ম্বনা কোন কোন সময় পৌঁছে যায় চরম নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে। আগে মানুষজন খুশি মনে হিজড়াদের যা দিতেন তাই তাঁরা আনন্দের সাথে নিতেন, দাবি থাকলে জানাতেন; থাকতো সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন ধূসর অতীত। সহনশীলতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বর্তমান সমাজ থেকে বিলুপ্তির মাধ্যমে জাদুঘরে আশ্রয়ের অপেক্ষায়! অবশ্য এর পেছনে শুধু এক পক্ষকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। সার্বিক ব্যবস্থাপনাতেই আছে বড় ধরণের গলদ। বর্তমান নাগরিক জীবনে ‘হিজড়া’ রীতিমত ভয়ঙ্কর এক আতঙ্কের নাম। পথে-ঘাটে-পার্কে-যানবাহনে-বাসা-বাড়িতে তাঁদের হঠাৎ উপস্থিতি জনজীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তাঁদের চাঁদাবাজি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, আক্রমণাত্মক আচরণ, অশ্রাব্য ভাষা, কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, নবজাতককে ছুঁড়ে ফেলা, অন্যদেরকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে নিজেকে আঘাত করা, কৃত্রিম হিজড়া তৈরি, যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ায় এইচআইভি ঝুঁকি, গ্রুপিং, লবিং এবং আন্ডার ওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তার কেন্দ্র করে খুনোখুনিসহ ভয়ঙ্কর সব লোমহর্ষক কাহিনী গণমাধ্যমে উঠে আসে প্রায়ই। ফলে হিজড়াদের প্রতি জনসাধারণের মানবিক অনুভূতি দারুণভাবে হ্রাস পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ একটি তরতাজা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আমার অত্যন্ত কাছের সন্তান সম্ভবা একজন ভদ্র মহিলার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ জানতে পারার পরপরই হিজড়ারা তিন-চারবার তাঁর বাসায় এসে রশিদ দেওয়া হবে মর্মে চাঁদা দাবি করেন এবং সন্তান জন্মগ্রহণের পর সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা (তাঁদের প্রতিনিধি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে উল্লেখসহ) দিতে হবে বলে হুমকি দিয়ে যায়। সন্তান জন্মের আগেই হিজড়াদেরকে টাকা দেওয়ার কথা আগে কখনও শোনা যায়নি। ভদ্র মহিলা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর চাকুরীর সামান্য বেতনে ছোট্ট একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে ঢাকা শহরে থাকেন। নতুন সন্তান জন্মগ্রহণের জন্য যদি শুধু হিজড়াদেরকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয় তাহলে তাঁর সংসার চলবে কিভাবে? চড়া দ্রব্যমূল্যের এই শহরে অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার ওপর হিজড়াদের এরকম অত্যাচার-জুলুম চলতে থাকলে যেকোন মুহূর্তে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য। নষ্ট হতে পারে সামাজিক সম্প্রীতি, হারিয়ে যেতে পারে মানুষের সহানুভূতি-শ্রদ্ধাবোধ। প্রচলিত রীতি (কোনভাবেই নিয়ম বা আইন নয়) অনুসারে সন্তান জন্মগ্রহণের পর হিজড়ারা আসলে সেই পরিবার খুশি মনে তাঁদের সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করে; কোনভাবেই ঐ পরিবারকে বাধ্য করা যায়না। অথচ বর্তমানে এমনটাই ঘটে চলেছে অহরহ। লোকলজ্জা বা সামাজিকতার ভয়ে হয়তো সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে বলতে পারছেননা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধা অস্বাভাবিক নয়। আর পুঞ্জিভূত সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে আমাদের শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনের বিপরীতে তৈরি হবে অত্যন্ত লজ্জাস্কর একটি উদাহরণ।

    অজস্র ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে প্রতিটি মানুষ তাঁর নাগরিক অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের অধিকার রাখেন। এর ব্যতিক্রম হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রচলিত সংবিধান অনুসারে যথাযথ প্রতিকার চাইতে পারেন। যদিও ‘হিজড়া’দের ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়াসমূহ বা আদৌ কোন আইনি প্রতিকার আছে কিনা সেটা জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং নির্দেশনা খুবই অপরিহার্য।

    দ্বিতীয় পর্ব

    অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে প্রতি দশ বছর অন্তর আদমশুমারি এবং প্রতি বছর অর্থনৈতিক সমীক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্নরকম জরিপ অনুষ্ঠিত হলেও আজও ‘হিজড়া’দের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় সম্ভব হয়নি। ‘আদম’ অর্থ ‘মানুষ’ হলেও এক্ষেত্রে তাঁদের হয়তো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা অনুভব করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ আদমশুমারিতে নির্দিষ্টভাবে ‘নারী/পুরুষ’-এর সংখ্যা উল্লেখ থাকে। এসময় যদি প্রতিটি মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে গণনার আওতায় আনা হয় তাহলে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীর’ প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় মোটেই অসম্ভব নয়। যদিও সমাজসেবা অধিদফতরের পুরানো একটি জরিপ অনুসারে দেশে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’র সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। ২০১২ সালে আইসিডিডিআরবি পরিচালিত জরিপ অনুসারে তাঁদের সংখ্যা নয় হাজারের কিছু বেশি। অভিযোগ আছে সেই জরিপে মাথা গণনা নয়, হিজড়া নেতাদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছে। যদিও হিজড়া নেতা আবুল হোসেন ‘ডয়চে ভেল (Deutsche Welle)’-র এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন “সারাদেশে তাঁদের সংখ্যা চল্লিশ হাজারের কম হবে না”। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থাসহ হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যানুসারে তাঁদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো হতে পারে। অর্থাৎ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বলা যায় পরিসংখ্যানের খেরো খাতা এখানে বড়ই অসহায়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘হিজড়া’দের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক বন্ধে দায়িত্বশীল মহলের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী।

    ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘লিঙ্গ’ যথা ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা সরকারি ইশতেহারে ঘোষণা দেয় যে, “বাংলাদেশ সরকার ‘হিজড়া সম্প্রদায়’কে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে”। এই ঘোষণা হিজড়াদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। ফলে তাঁরা ছোট থেকেই নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে উৎসাহিত হবে। বর্তমানে দেশজুড়ে বছরব্যাপী অনেক দিবস পালিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় কোন একটি দিনকে “হিজড়া লিঙ্গ দিবস” হিসেবে তাঁদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হলে সেটা হিজড়াদের জন্য বিরাট সম্মান বলে বিবেচিত হবে, পাশাপাশি জাতি হিসেবে গৌরবান্বিত হবো আমরাও। এদিকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ২০১৮ সালের ১০ জুলাই ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’কে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক হিজড়াদের নাম অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হলে সেটা হবে দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্তমূলক একটি অগ্রগতি। আর হিজড়ারাও প্রকৃত নাগরিক মর্যাদা উপভোগের মাধ্যমে মূল স্রোতধারায় ফিরতে পারবেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন পাঁচজন হিজড়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগের জন্য নির্ধারিত কোটা থেকে অন্তত প্রতীকি হিসেবেও একজনকে মনোনয়ন দিলে; আরো অনেক কাজের মতো বিশ্ব অঙ্গনে আবারো মাহিমান্বিত হতেন তিনি; মহিমান্বিত হতো তাঁর দল “আওয়ামী লীগ” এবং অবশ্যই “বাংলাদেশ”। স্থাপন হতো বিরল একটি দৃষ্টান্ত। তবে এবার না হলেও আগামীতে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’র যোগ্য কোন সদস্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সেটা নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটায় নয়; আপন লৈঙ্গিক পরিচয়ে, সগর্বে। তাই মহান সংসদে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে হিজড়াদের জন্য ছোট্ট করে হলেও সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও আগামীতে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁদের দলীয়ভাবে মনোনীত করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না বলে প্রত্যাশা রইলো। তবে আশার কথা হচ্ছে পরিবর্তনের একটি হাওয়া কিন্তু লাগতে শুরু করেছে; জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশ সেবার অধিকার যে হিজড়াদেরও আছে সেই দাবি তাঁরা ইতোমধ্যে রাখতে পেরেছেন। আমাদের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার বিপরীতে বলিষ্ঠ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে যা ইতিবাচক একটি অর্জন।

    আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিজড়া প্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে। সাবেক মার্কিন প্রসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে হোয়াইট হাউসের নিয়োগ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারী এবং তাঁদের অধিকার আদায়ের কর্মী “রাফি ফ্রিডম্যান গুর্সপান”। হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রথম সদস্য হিসেবে ভারতে বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করেছেন “জয়িতা মন্ডল”। ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়গড় মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য “মধু কিন্নর” মেয়র নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের মতো উগ্র ধর্মীয় মতবাদের দেশেও “মারভিয়া মালিক” নামে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য সংবাদ উপস্থাপক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মডেল হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। দৃষ্টান্ত আছে বাংলাদেশেও। সাতক্ষীরার কলারোয়াতে পৌরসভা নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন “দিথি বেগম” এবং “সুমি খাতুন” নামে দুইজন হিজড়া। বিউটি পার্লার ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করছেন “শাম্মী” হিজড়া। এদিকে হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারও গ্রহণ করেছে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কর্মসূচি। যেমন, “ (১ স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে চারস্তরে জনপ্রতি মাসিক (প্রাথমিক-এ সাতশত, মাধ্যমিক-এ আটশত, উচ্চ মাধ্যমিক-এ এক হাজার এবং উচ্চতর পর্যায়ে বারোশত টাকা হারে) উপবৃত্তি প্রদান। (২) পঞ্চাশ বছর বা তার থেকে বেশি বয়সী অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের মাসে ছয়শত টাকা করে ভাতা প্রদান। (৩) বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়বৃদ্ধিমূলক কাজকর্মে যুক্ত করে সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা। (৪) প্রশিক্ষণোত্তরদের দশ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান। এখন এসকল কর্মসূচির সুফল প্রকৃত হিজড়ারা পাচ্ছেন কিনা সে বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের যেমন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি তাঁদের জীবন-মান স্থায়ীভাবে উন্নত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আহবানে কয়েকজন হিজড়া সদস্য সরকারি চাকুরির জন্য সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেন; ২০১৫-এর জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের “প্রকৃত হিজড়া সনাক্তকরণের যথাযথ পদক্ষেপ হিসেবে সবার শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে” নির্দেশের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১২ জনকে একটি সরকারি হাসপাতালে শারীরিক পরীক্ষা করতে বলা হয়। সেই কথিত পরীক্ষায় ঐ ১২ জন হিজড়া যৌন হয়রানিসহ নানারকম হেনস্থার শিকার হন বলে অভিযোগ আছে। এ ধরণের স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট উদার এবং সচেতন হলেই সরকারের পদক্ষেপসমূহ সফল হবে। বৈশ্বিক করোনাকালীন এই দুর্যোগে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে যথাযথ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে হিজড়াদের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে তাঁরা জনবোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

    পরিশেষে হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহবান- কারো করুণা, মুখাপেক্ষী বা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে অভিশপ্ত জীবন নয়, এগিয়ে আসুন আলোর পথে। সংবিধানে দেওয়া নাগরিক অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপন করুন। আর তাঁদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে সমাজ-রাষ্ট্র’কে এগিয়ে আসতে হবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকায়। এভাবেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠিত হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। নতুন ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় শিহরিত হবে সবুজ-শ্যামল বাংলার মা ও মাটি, বিস্তৃত হবে অনাবিল শান্তির মেলবন্ধন। আর হ্যাঁ, অনন্ত শুভেচ্ছা সন্তান সম্ভবা সেই ভদ্র মহিলা এবং তাঁর অপেক্ষমান সন্তানের জন্য। জয়তু বাংলাদেশ।।।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    অনেকদিন পর রাজ্যে কমল করোনা সংক্রমন , উদ্বেগের কারণ কলকাতা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : গত কয়েকদিন পর সামান্য কমল করোনা সংক্রমণ। কমল মৃত্যুর সংখ্যাও। গত তিনদিন ধরে বাংলায়...

    প্রয়াত নাট্যজগতের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শাঁওলি মিত্র !

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : প্রয়াত বাংলার অন্যতম বিখ্যাত নাট্যকার শাঁওলি মিত্র। আজ দুপুর তিনটের সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ...

    দীর্ঘদিন স্কুল কলেজ বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই , বললেন বিশ্ব ব্যাংকের কর্তা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : করোনা থেকে শিশুদের রক্ষা করতে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ স্কুল, কলেজ...

    ওমিক্রনের উপসর্গের সাথে অন্য ভ্যারিয়েন্টের পার্থক্য কি ? দেখুন কি বলছে বিশেষজ্ঞরা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ওমিক্রনের ফলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। ওমিক্রনে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে বটে। কিন্তু...

    আর ৭ দিন নয় , এবার ৫ দিন হতে পারে হোম আইসোলেশনের মেয়াদ !

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : আর ৭ দিন নয়, এবার থেকে করোনায় আক্রান্ত হলে ৫ দিন হোম আইসোলেশনে থাকলে...