21 C
Kolkata
Tuesday, November 29, 2022
More

    কেন, কী কারণে আজকের এই নরেন্দ্র মোদি যুগ , শেষ দেখায় বলেছিলেন প্রণব বাবু – দেবারুণ রায়

    সেই সেনা হাসপাতালের ঘরটা মনে পড়ছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলার কংগ্রেসের সর্বময় নেতা হিসেবে নদীয়ার গ্রামীণ এলাকায় জাতীয় সড়কের ওপর দুর্ঘটনায় মৃত্যুমুখ থেকে দিল্লি ফিরে ওই কেবিনে ভর্তি। মাথার তালুতে আঘাত ও প্রচণ্ড রক্তপাতের কারণে বেশ কয়েকটি স্টিচ পড়েছিল। গ্রামের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তরুণ ডাক্তার তাঁর জীবনদাতা হয়ে উঠেছিলেন। তারপর আর্মি রেফারাল হাসপাতালের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। জীবনের সব ফ্রন্টে লড়াই করেছেন। তাই ভেবেছিলাম এই লড়াইটাও হয়তো জিতেই যাবেন।

    কিন্তু মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সঙ্গে এল কোভিড ৮৬ বছরের রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুদূত হয়ে। গভীর কোমাচ্ছন্ন হয়েও অবচেতনে তাঁর প্রাণবায়ু সঞ্চার করে গিয়েছে জীবনীশক্তি। কিন্তু ভেন্টিলেটর আর ফুসফুসের সংক্রমণের থেকে বেরনোর মত প্রাণ আর কোথায় পাবেন ? তাই সব প্রতিরক্ষা ভেদ করে অনিবার্য অন্ত

    এল সোমবার। তারপর অনন্ত বিশ্রাম । সারাদিন ও রাত দেড়টা পর্যন্ত অবিরাম কাজ করে কাজের মধ্যেই অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়তেন। জনজীবনের অর্ধেক শতক সময়ে এটাই রুটিন। কাজটাই ছিল বিনোদন। রাজনীতির পাট চুকিয়েও অরাজনৈতিক জীবন কাটাননি। সদা সজাগ সতর্ক নির্ভেজাল বিজ্ঞাপনহীন দেশসেবক আপাদমস্তক হিন্দু ব্রাহ্মণের সনাতনী সংস্কারে অভ্যস্ত থেকেও গীতা নয় সংবিধানকেই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনায়কের একমাত্র ধর্মগ্রন্থ মানতেন। বলতেন, আমার আস্তিকতা মূলত পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাছাড়া ধর্ম বিশ্বাস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়। এনিয়ে ঢাক পেটাতে নেই।

    ভারতরত্ন প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাংবাদিক দেবারুন রায়

    ভারতীয় রাজনীতিতে মোদি ফ্যাক্টর নিয়ে একেবারে নিজে থেকে একান্তভাবে কিছু কথা বলেছিলেন। আমি তখন সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক পর্ব পার করে কলকাতায় ফিরেছি বছর খানেক। কলকাতায় আসছেন জানালেন ফোনে। চিরাচরিত ভাবে বললেন, অমুক দিন ঢাকুরিয়ায় চলে আয়। সেই দিনে পৌঁছে দেখি দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত সেরে একা বসে আছেন তাঁর ঘরটিতে । ওঁর চির সহচর হীরা আর পদম যথারীতি হুজুরে হাজির । দু ঘরে দুজন। ওঁর সঙ্গে সেটাই শেষ দেখা। সাধারণ কথাবার্তা সেরে নাগপুরে আরএসএসের সদর দফতরে ওঁর বিতর্কিত উপস্থিতির কথা তুললাম। কংগ্রেসের কেউ কেউ ওঁকে আক্রমণ করেছিলেন। সর্বোচ্চ আসন থেকে অবশ্য তেমন কিছু না থাকলেও ছিল ঠাণ্ডা নীরবতা। কংগ্রেসের এই অস্বস্তি মেনে নিতে অসুবিধে ছিলনা প্রণববাবুর। বললেন, আমার মেয়ে যা বলেছিল সেটাই সত্যি হল। জিজ্ঞেস করলাম, শর্মিষ্ঠার নির্দিষ্ট কোন কথাটা বলছেন ? উনি বললেন, “ও বলেছিল, তোমার কথাগুলো কেউ মনে রাখবেনা। শুধু থেকে যাবে তোমার নাগপুরের ছবি। সেকথাই সত্যি হল। আমি যা যা বললাম কেউ সেই কথাগুলো শোনেনি বা মনে রাখেনি।” প্রণববাবুর আক্ষেপ এবং দুঃখ, ওঁর ছবি বিকৃত করা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মোহন ভাগবত সংঘের কুচকাওয়াজে যে সংঘীয় মুদ্রায় সংঘের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ভাবে সেই পোশাক পড়িয়ে বিকৃত করা হয়েছে প্রণবকেও। বললেন সবকিছুই কানে এসেছে। তাই তো বললাম ওই কথাটাই সত্যি হল। এবার রাষ্ট্রনায়কের মুখে এল যেকথাটি তা কিন্তু আমার  জিজ্ঞেস করা হয়নি তখনও। শিক্ষকের মতো করেই চিরদিন বলেন। সেভাবেই বললেন, “১৯৪৭ এর পর থেকে একদিকে দক্ষিণপন্থী শক্তি ও অন্যদিকে বামপন্থীরা যেভাবে কংগ্রেস বিরোধিতার রাজনীতি করে এসেছে, তার নীট ফল হল নরেন্দ্র মোদি।” প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করি, এখন তো নেহরু বিরোধী আক্রমণের মোকাবিলা করছে বামেরাই। সংঘ , বিজেপির মূল মতাদর্শগত আক্রমণের লক্ষ্যে যখন স্বাভাবিকভাবেই জওহরলাল নেহরু, তখন কংগ্রেসের পাশে পাল্টা জবাবে অনেক বেশি সোচ্চার তো কমিউনিস্টরাই। প্রণব মুখোপাধ্যায় বললেন,” ঠিকই। কিন্তু এটা একটা সামাজিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এতে সুইচ অন করলেই আলো জ্বলে উঠবে তা নয়। আলো জ্বলতে সময় লাগবে। সেকথাই কেউ বুঝতে পারেনি।” এবারে আমার প্রশ্ন ছিল যা তাতে” দাদা” যে ধরা দেবেন না তা নিশ্চিত ছিল। তবু বললাম, কিন্তু দাদা , আপনি এই পরিস্থিতির জন্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বকে একটুও দায়ী করবেন না ? ইউপিএর এক দশকের শাসনে নেতা যদি অন্য কেউ হতেন এবং যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই যদি চলতো তাহলে কি আজকের বাস্তবতা অন্যরকম হতো ? এবার চাণক্যের জবাব এল : “সাংবাদিকের চোখে তো আমি দেখছিনা। আমি দেখছি ইতিহাসের গতিপথ। কিন্তু আমি বলতে গেলেই যে যার দৃষ্টিতে তার বিচার করে। আমি কোনও বিশেষ দৃষ্টিকোণ দিয়ে আজকের পরিস্থিতি বিচার করছিনা। এসবের ঊর্ধে উঠে বলছি। কিন্তু কেউ তা শুনবেনা। এটাই আজকের বাস্তবতা।”

    বাকি সব ব্যক্তিগত পরিসরের কথা সেরে প্রণাম করে আসার আগে এই ৩৫ বছরের সম্পর্কে প্রথম ছবি তোলার জন্য বসলাম ওঁর কাছে। ছোট্ট ডিভানে উনি বসেছিলেন। পাশে বসে সেলফি নিতে যেতেই পদম এসে বলল, দাও আমি তুলে দিচ্ছি। তারপর পরপর কটা ছবি। ওঁর সান্নিধ্যে স্নেহছায়ায় কেটে যাওয়া দিল্লির ছাব্বিশ বছর আর কলকাতার এক দশকের স্মৃতির ওটাই শেষ অংক।  সময় ওখানেই চিরায়ত, স্থির। তারপর ফোনে কথার অবকাশ। ভারত আরও এক রত্নহীন হল। বিজয়া দশমী, নিউ ইয়ারের দিন প্রণাম জানাতেই আশীর্বাদের এমন আন্তরিক উচ্চারণ আর কোনও রাজপুরুষের কণ্ঠে শুনব না কোনওদিন।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    চাঁদে পাকাপাকি ভাবে থাকবে মানুষ !

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : চাঁদের মাটিতে শেষবার মানুষ পা রেখেছিল গত অর্ধ শতাব্দী আগে। এই বার সেখানে ঘর-বাড়ি...

    নির্দিষ্ট কিছু পুরনো কয়েন সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে RBI !

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ১ টাকা এবং ৫০ পয়সা মূল্যের নির্দিষ্ট কিছু পুরনো কয়েন সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে...

    স্বামী বিবেকানন্দর পুনর্জন্ম মোদী , বেফাঁস মন্তব্য রাহুল সিনহার

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : বেফাঁস বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা। স্বামী বিবেকানন্দ পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি রূপে,...

    বিশ্বকাপে আফ্রিকান দাদাগিরি ! বেলজিয়ামকে ঘায়েল করল মরক্কো

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : মরক্কো ২ আবদেলহামিদ সাবিরি (৭৩’), জাকারিয়া আবৌখাল (৯০+২’)  বেলজিয়াম ০

    ইন্ডিয়ান সুপার লিগে বিরাট জয় পেল ইস্টবেঙ্গল

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগছিল ইস্টবেঙ্গল। ইন্ডিয়ান সুপার লিগে অ্যাওয়ে ম্যাচে জামশেদপুর এফসির বিরুদ্ধে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল।...