28 C
Kolkata
Thursday, August 11, 2022
More

    এক অসহায় নেপালী গ্রাম ‘কিডনি ভ্যালী’

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো:মাঝে মাঝেই সোসাল মিডিয়াতে একটি মিম ঘুরতে দেখা যায়, যেখানে কেউ আইফোন কেনার মূল্য হিসেবে নিজের কিডনি বিক্রির কথা বলেন, আবার কেউ কেউ হাসি ঠাট্টাতেও নিজের কিডনি বিক্রি করার কথা বলে থাকেন। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, আমাদের ছোট্ট প্রতিবেশী দেশ নেপালে এমন গ্রাম রয়েছে যাকে সকলেই চেনেন, ‘কিডনি ভ্যালী’ নামে। হ্যাঁ, নেপালের ‘হোকসে’ গ্রাম সমগ্র নেপাল দেশ তথা বিদেশের কাছে পরিচিত ‘কিডনি হারানো মানুষদের গ্রাম’ হিসেবে।

    পরিসংখ্যান বলছে এই গ্রামের ১০০% মানুষেরই একটি করে কিডনি নেই। না জন্মগত ভাবে নয়, কোনো না কোন স্বপ্ন পূরণের জন্যে বা ‘অঙ্গ দালাল’ এর খপ্পরে পরে হারিয়েছেন তার শরীরের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সবাই যে সঠিক অর্থ রোজগার করতে পেরেছেন তা নয়, এদের মধ্যে বেশীরভাগেরই কপালে জুটেছে খুব স্বল্প অর্থ আর সামাজিক অসহযোগিতা। এমন কী এই গ্রামের বহু মানুষ কেই দালালর এই বুঝিয়ে কিডনি কেটে নিয়েছিল যে সেটি আবার নতুন করে গজিয়ে যাবে!

    এই যেমন গীতা (৩৭ বছর), স্বামী ও সন্তান নিয়ে একটি বাড়ি তৈরির আশায় টাকা রোজগারে ভারতে আসেন এবং ৮০,০০০ হাজার নেপালি টাকায় তার কিডনি বিক্রি করেন। সেই টাকাতে একটা ছোট বাড়ি বানাতে পারলেও, গত ভূমিকম্পে সব মাটিতে মিশে গিয়েছে। বর্তমানে তারা পলিথিন আর পাথর দিয়ে তৈরি ছোট ঘরে কোনোমতে থাকছেন।

    গীতা বলেন যে তার ভগ্নীপতি তাকে ভারতে এসে কিডনি বিক্রি করার কথা বলেন এবং তাকে এও বোঝানো হয় যে কিডনি কেটে নেওয়া হলেও আবার নতুন কিডনি গজাবে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন যে তার বোন ও ভগ্নীপতি মিলে তার কিডনি চুরি করেছে।

    তবে গীতা একা নন। হোকসে গ্রামে বাস করা ৯০% প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলা তথাকথিত নেপালের অর্গান ব্রোকার’দের কাছে তাদের একটি স্বাস্থ্যকর কিডনি নগদ দামে বিক্রি করেছেন।

    এই অঙ্গ ক্রয়ের দালাল’রা মসৃণ উপায়ে অঙ্গ কেনার জন্যে কাবেরীপালঞ্চৌক জেলার হোকসে এবং এর আশেপাশের গ্রাম গুলিতে নগদ টাকার প্রলোভনে লুব্ধ গ্রামবাসীদের খোঁজে ঘুরে বেড়ান এবং দক্ষিণ ভারতে নিয়ে এসে কিডনি বিক্রির কথা জানান। উল্লেখ্য দক্ষিণভারত ইতিমধ্যেই সমগ্র ভারতের একটি চিকিত্‍সা হাব হয়ে উঠেছে যেখানে বেআইনি উপায়ে কিডনি কেনা বেচার আন্তর্জাতিক চক্র বেশ সক্রিয়।

    গীতার মতই এই গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ নিজের কিছু না কিছু স্বপ্ন পূরণের জন্যে কিডনি বিক্রি করেছেন এবং প্রতিশ্রুতি মত টাকা না পেয়ে মানসিক হতাশা ও সেই সাথে সাথে জটিল শারিরীক রোগে ভুগছেন।

    নেপালে কিডনি পাচার একটি উদীয়মান বাণিজ্য। এবং বর্তমানে তা নেপাল দেশটিকে একটি ‘কিডনি ব্যাংক’-এ পরিণত করেছে। চিকিত্সা বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে দেশে কিডনি বিক্রি করা লোকসংখ্যা আগামী বছরে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

    আক্রান্তরা নিজেদের শরীরে কাটা দাগ দেখাচ্ছেন

    এই অবৈধ বাণিজ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ক্রয়কৃত কিডনি পাচারের সাথে জড়িত আনুমানিক ১০,০০০টির ও বেশি কালোবাজারি ক্রিয়াকলাপ বার্ষিকভাবে সঞ্চালিত হচ্ছে।

    গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে প্রতি বছর ৭০০০ কিডনি অবৈধভাবে নেপাল থেকে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় সেই একই প্রতিবেদনে এও দেখানো হয়েছে যে অবৈধ অঙ্গ ব্যবসায় এক বছরে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করেছে কালোবাজারিরা।

    নেপালে এই অঙ্গ পাচার বিভিন্ন উপায়ে পরিচালিত হয়। কখনো অপহরণ করে ক্ষতিগ্রস্থদের অঙ্গ দিতে বাধ্য করা হয়; কিছু, লোক আর্থিক হতাশার জন্যে অঙ্গ বিক্রি করতে রাজি হয়; অথবা তাদের ফাঁকি দিয়ে বোঝানো হয় যে তাদের শরীরে অজানা রোগের কারণে অপারেশনের প্রয়োজন এবং তারা পরে জানতে পারেন যে তাদের কিডনিটি তাদের অজান্তেই অপসারিত হয়েছে।

    যদিও কিছু ক্ষতিগ্রস্থকে আগেই মোটা অঙ্কের টাকা প্রদান করা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুন করতেও পিছপা হয় না দুষ্কৃতীরা। এই কাজে শিশুরা, বিশেষত দরিদ্র পরিবার থেকে আসা বা প্রতিবন্ধী শিশুরা প্রায়শই পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তু হয়।

    নেপালের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল কিডনি প্রতিস্থাপন করে। এমনকি নেপালের চিকিত্সকরাও জানেন যে বেশিরভাগ নেপালি মানুষ সুস্থতার জন্যে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে পছন্দ করে। ‘জাতীয় কিডনি কেন্দ্রের পরিচালক ডাঃ ঋষি কুমার কাফল বলেছিলেন- ‘তারা আরও ভাল পরিষেবা চায়, তারা চায় ভারতীয় ডাক্তার। এ কারণেই তারা ভারতের হাসপাতালে যান”। তিনি আরও বলেন যে দক্ষিণ ভারতের হাসপাতালে একবার ‘কিডনি’ কাটানোর পরে, অঙ্গগুলি ধনী প্রাপকদের কাছে, দাতাকে যা দেওয়া হয় তার থেকে ছ’ গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

    দক্ষিণ ভারতের হাসপাতালে একবার ‘কিডনি’ ‘কাটানোর পরে, অঙ্গগুলি ধনী প্রাপদের কাছে, দাতাকে যা দেওয়া হয় তার থেকে ছ’ গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

    ফোরাম ফর প্রটেকশন অফ পিপলস রাইটস নেপাল (পিপিআর নেপাল) এর নেপালি এনজিওর আইনজীবী এবং এই প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী লক্ষ্মণ লামিচেনে বলেছেন: ‘সুরক্ষা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও লোকেরা এখন নেপালের যে জায়গাগুলিতে বাস করছে সেখানে যথেষ্ট নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে।

    তার মতে- ‘প্রতিদিনের জীবনে তাদের অনেক নতুন মুখের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ কেউ মানব পাচারকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতে এবং বিদেশে ভাল চাকরি এবং উন্নত জীবনযাপনের লোভ দেখানোর চেষ্টা করছেন। ‘

    কিডনি বিক্রির ফলে নেপালের লোকেরা তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায়শই দূরে সরে যায় এবং তাদের এড়িয়েও চলা হয় যায়। এ প্রসঙ্গে নেপালের ফোরাম ফর দ্য প্রটেকশন অব পিপলস রাইটস (পিপিআর) এর একটি প্রতিবেদনও পাওয়া গিয়েছে।

    পিপিআর নেপালের আইনজীবী কৃষ্ণ পিয়ারি নাকারমি, কিডনি পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সাথে কাজ করেছেন। তিনি বলেছিলেন: ‘যখন সেই লোকটি কিডনি বিক্রি করে প্রতারিত হয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিল, তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রায়শই তাকে এড়িয়ে চলতেন এবং ক্রমেই তিনি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাদের সম্প্রদায় থেকে একঘরে করা হয় কারণ কিডনি বিক্রি অপরাধ ও পাপ বলে মনে করা হয়।

    ‘এমনকি তাদের বাচ্চাদেরও স্কুলে বৈষম্যর শিকার হতে হয়। এতে তারা ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ে এবং তা তাদের মদ্যপানের দিকে পরিচালিত করে”। এই লোকেরাই মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘হোকসে’র মত যায়গায় অস্থায়ী গ্রাম বানিয়ে বাস করছে। যদিও ২০০৭ সালে, নেপালি সরকার কিডনি বিক্রয় নিষিদ্ধ শীর্ষক একটি আইন পাস করে। তবুও কালবাজারি তার করাল হাত এগিয়ে রেখেছে নেপালের দিকে।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    কমনওয়েলথে সোনাজয়ী অচিন্ত্যকে রাজ্য সরকারের ৫ লক্ষ!‌ ‘খেলা দিবসে’ আর্থিক পুরস্কার সৌরভকেও

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : কমনওয়োলথ গেমসো ভারোত্তোলনে সোনা জয়ী অচিন্ত্য ও স্কোয়াশে ব্রোঞ্জ জয়ী সৌরভ ঘোষাল। দুই...

    সরাসরি ধর্মতলা থেকে হাবড়া এক বাসেই , দেখুন সম্পূর্ণ তথ্য

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : এবার সরাসরি ধর্মতলা থেকে হাবড়া এক বাসে যাওয়া যাবে।ওই বাসে পৌঁছে যাওয়া যাবে বকখালিও।...

    সঞ্জীবনী সঞ্চার বঙ্গ বিজেপিতে , এলেন নতুন পর্যবেক্ষক

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : বিজয়বর্গীয় যুগের অবসান। নয়া পর্যবেক্ষক পেল বঙ্গ বিজেপি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুনীল বনশলকে...

    নির্ধারিত সূচির আগে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বকাপ , জানাল FIFA

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : নির্ধারিত সূচির একদিন আগে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বকাপ। কাতারে প্রচণ্ড গরমের কারণে শীতকালে ফুটবল...

    একেই বলে ঈশ্বরের কৃপা ! ৭০ বছর বয়সে মা হলেন চন্দ্রাবতী দেবী

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : একে বলে ঈশ্বরের আশির্বাদ ! দশকের পর দশক ধরে চেষ্টাতেও সম্ভব হচ্ছিল না, এবারে...