22 C
Kolkata
Tuesday, January 25, 2022
More

    অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় সাইকেলে করে পৌঁছে গেলেন কলকাতা থেকে লাদাখের ‘টপ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ‘ এ, ‘ঘরের ছেলে’ বিরাটির বিপ্লব দাস


    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরোঃ অ্যাডভেঞ্চার এর নেশা, দুচোখ ভরা স্বপ্নে। ইচ্ছা আর মনের জোর মানুষকে পৌঁছে দেয় তার লক্ষ্যে, আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন বিরাটির ‘বড় ফিঙ্গা’র ছেলে বিপ্লব দাস। গত ২৮ শে জুলাই নতুন কিছু করার নেশায় ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ বার্তা নিয়ে চেপে বসলেন সাইকেলে। সাইকেল রাইডিং এর কোন অভিজ্ঞতা তার নেই। জানেন না চাকার পাংচার টুকু সারতে। মনের জোরকে সঙ্গী করে, পকেটে অল্প কিছু টাকা নিয়ে প্রথম সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে, পৌঁছে গেলেন কলকাতা থেকে লাদাখ। করে দেখালেন এক কঠিন কাজ।

    অতি প্রতিকূল পরিবেশে, প্রচন্ড ঠান্ডা আর দুর্গম রাস্তা পার করে ৬৩ দিনে লাদাখ প্রবেশ করে ৬৬ দিনের মাথায় শুক্রবার দুপুর ২:৪৫ মিনিটে ছুঁয়ে দেখলেন ‘টপ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’, বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটর সড়ক লাদাখের, লেহ জেলার অন্তর্গত খারদুংলা পাস।এ যেন আরেক ‘শঙ্করের’ অ্যাডভেঞ্চারের গল্প।

    ছোট থেকে খেলাধুলার প্রতি তার অদম্য টান। স্কুলে যাওয়ার পথে দেখতেন, নব-নগর ফুটবল কোচিং সেন্টারে বিভিন্ন বয়সের ছেলেরা ফুটবল খেলছে। তাই দেখে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় একদিন স্কুলের বুট পরে প্রথম কিক করলেন ফুটবলে। নেমে পড়লেন মাঠে।

    পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে, নিজের পকেট খরচ জমিয়ে ৫০ টাকা এবং কোচিং মাস্টার ও মাসির দেওয়া ৫০ টাকা করে জমিয়ে তাই দিয়ে কিনে ফেললেন প্রথম বুট। এরপর শুরু হল ‘বুটে-বলে’ খেলার মাঠে স্বপ্নবোনা। তিনি কুমারটুলি, কালীঘাট ফ্রেন্ডস, মুসলিম ইনস্টিটিউট এর মত বাংলার প্রথম সারির ক্লাবগুলোতে খেলেছেন। খেলেছে, ইস্টবেঙ্গল আন্ডার ফিফটিনে।

    প্রতিটি মানুষের জীবনে ট্রাজেডি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একদিন হঠাৎ করেই জীবন তার কঠিন চেহারা দেখায়। আর্থিক অপ্রতুলতা প্রথম থেকেই ছিল বাবা-মা ও বিপ্লবের ছোট্ট পরিবারে। তবে তার দিনমজুর বাবার আকস্মিক দুর্ঘটনা, তাকে বাধ্য করে স্বপ্নের ফুটবলের ইতিহাসে ইতি টানতে। পরিবারের হাল ধরতে হয় বিপ্লবকে। বর্তমানে ব্যারাকপুর কমিশনারেট এর নিমতা থানায় সিভিক ভলেন্টিয়ার বিরাটির বিপ্লব।

    এরপর একদিন পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন পাহাড় ঘুরতে। পাহাড়ে গিয়ে অনুভব করলেন ট্রেকিং এর প্রতি টান। সেই মতই কাজ, ভর্তি হয়ে গেলেন পর্বত আরোহণের ট্রেনিংয়ে। অল্প দিনের মধ্যে সাফল্য আসলো সেখানেও। পেলেন সরকারি স্কলারশিপ। পায়ে পায়ে ছবি আঁকলেন অমরনাথ থেকে সান্দাকফুর বুকে।

    আরও পড়ুন : প্রথম ভারতীয় মহিলা এবং প্রথম বাঙালি হিসাবে, অক্সিজেন ছাড়াই ৮১৬৭ মিটার উচ্চতার ধৌলাগিরি শৃঙ্গ জয় করলেন চন্দননগরের পিয়ালী

    এরপর একদিন হঠাৎ করে নতুন কিছু করার ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিলেন,পাহাড়েই তিনি যাবেন তবে তাতেও সৃষ্টি করবেন নতুন ইতিহাস। তাই বেছে নিলেন বাইসাইকেল কে। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় এক প্রিয় বন্ধুর সহযোগিতায় কিনে ফেললেন এই দুঃসাহসিক কাজে, তার পুরো অভিযানে সর্বক্ষণের একমাত্র সঙ্গী, দু চাকার বাহনটি।

    পুরো অভিযানে অনেক বাধা বিপত্তি পার করতে হয়েছে তাকে। বেশ কয়েকবার সাইকেলও খারাপ হয়েছে পথে। যত অগ্রসর হয়েছেন দুর্গম রাস্তা ও ঠান্ডায় বাধা প্রাপ্ত হয়েছেন। ‘নাকেলা পাস’ পৌঁছাতে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে যাওয়ায় প্রচণ্ড ঠান্ডায় থামাতে হয়েছে সেদিনের জার্নি। সার্চুর পর থেকে পার করতে হয়েছে ২১ খানা অতি দুর্গম পাস। ‘পাং’ থেকে ‘ডেব্রিং’ যাওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল ভয়ঙ্কর।

    পুরো অভিযানটি তিনি একাই ছিলেন। কখনো কখনো পথে অন্যান্য জায়গার আরও কিছু সাইকেলিস্ট এর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কয়েকদিন করে পথ অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সঙ্গেও। পকেটে টাকা কম, সঙ্গে ছিলনা টেন্ট ও। দিল্লি পৌঁছে কেনেন একটি টেন্ট। রাত কেটেছে গুরু দুয়ার, ধরমশালা, আর মন্দিরে।

    মা বাবা ও আত্মীয়দের সাথে বাড়িতে ।

    প্রতিদিন লক্ষ্য ছিল সিটি টু সিটি অথবা এক গুরুদুয়ার থেকে আরেক গুরুদুয়ার। তাতে মিলেছে রাত কাটানোর সুবিধা। কখনো কখনো পকেটের টাকা কম থাকায় অথবা কাছাকাছি কোন এটিএম না পাওয়ায় ধাবার মালিককে অনুরোধ করে অর্ধেক প্লেট খাবার নিয়ে, অল্প ক্ষুধা নিবারণে কাটিয়েছেন রাত। পুরো অভিযানে ডাল, ভাত, রুটি,সব্জি ছিল তার রোজকার খাবার।

    পুরো অভিযানে, একদিনে সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম  করেছেন গুরগাঁও থেকে পানিপথ। ১২৯ কিলোমিটার পথ, সময় লেগেছে ১৩ ঘন্টা। হিমাচল, মানালি হয়ে প্রবেশ করেছেন তিনি লাদাখে। যদি পকেট ও শরীর সাথ দেয় তাহলে তার ইচ্ছা আছে, এক চক্কর সম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ফিরে আসার জার্নি শুরু করবেন জম্মুর পথ ধরে।

    আরও পড়ুন : এশিয়ার প্রথম মহিলা সাঁতারু হিসাবে, হাঙ্গরে ঘেরা ‘মলোকাই চ্যানেলে’ নামতে চলেছে বাঙালি ‘জলকন্যা’ সায়নী দাস, চোখে সপ্তসিন্ধু জয়ের স্বপ্ন

    আজ সামিট ছুঁয়ে ফিরে আসার পথে এক সুন্দর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন তিনি। লেহের কাছে অবস্থিত সোনম ওয়াংচুক এর The Students’ Educational and Cultural Movement of Ladakh (SECMOL) অল্টারনেটিভ স্কুল, এক পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস। যারা লাদাখের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ করে। যে সমস্ত লাদাখি যুবক যুবতীরা কলেজে পড়াশোনা করে তাদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের আয়োজন করে থাকে এই সংস্থা। তাদের একটি অনুষ্ঠান ছিল।

    আজ ফেরার পথে বিপ্লবের সাইকেলে কলকাতা টু লাদাখের ব্যানার দেখে তারা বিস্মিত হয়ে যায়। তার এই অদম্য উৎসাহ কে সম্মান করতে, তাকে ডেকে নেওয়া হয় তাদের অনুষ্ঠানে এবং বেশ কিছু সময় সেখানকার স্থানীয় উদ্যমী যুবক যুবতীদের মধ্যে কাটিয়ে দারুন মুহুর্ত অনুভব করেছেন তিনিও। সাক্ষাতের কথা হয়েছে লাদাখের এসপি – র সঙ্গে। দেখা হতে পারে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর সঙ্গেও।

    এই অভিযান সম্পন্ন করতে পেরে কার্যত ভীষণ খুশি বিপ্লব। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার এই পুরো অভিযান টি সফল করতে মানসিক শক্তি যোগানো তার কাছের বন্ধু পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদেরকে। বিপ্লব পাশে পেয়েছেন তার বন্ধু অনিক, সৌমি, বিনয়,তয়ন , ভিকি ,লাল্টু ,মুন্না , রাম, বিজয়, টুকুন,পলাশ ,বুবাই ও আরও বন্ধু ও দাদাদের । পাশে পেয়েছেন সাইক্লিস্ট অরুনাভ বাবু , তরুণ বিশ্বাস আর সবার পরিচিত সত্যেন দাসকে , যিনি রিকশা নিয়ে লাদাখ গিয়েছিলেন । সমস্ত কীট দিয়ে সাহায্য করেছে স্পোর্টস গার্মেন্টস নির্মাতা “ট্রাক অলনি” । নিমতা থানার সকল অফিসার ও তার সহকর্মীরা সাধ্য মতো পাশে থেকেছেন ।

    বিপ্লব জানিয়েছেন, পেশায় সিভিক পুলিশ হওয়ায় বহু ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা সামনে থেকে দেখেছেন। যা ভিতর থেকে নাড়া দিয়েছে তাকে। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অতি সফলতা বার্তা ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইভ’ কে বেছে নিয়েছেন তিনি। বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছাতে চান তিনি।  আগামীতে তার ইচ্ছা আছে যদি সম্ভব হয়, প্রতিটি রাজ্যে তিনি পৌঁছে যাবেন এই বার্তা নিয়ে। যদি, তার ফলে একটি মানুষের জীবনও বাঁচে, তাহলেই তার নিজের জীবন হয়ে উঠবে ধন্য।

    লাদাখে পৌঁছে পরিচয় হওয়া টুরিস্ট গাইড সুরীন্দর রাউতের সঙ্গে অল্প সময়েই গড়ে উঠেছে বেশ ভালো বন্ধুত্ব। তিনিও এই বাঙালি বন্ধুর আতিথেয়তায় জোগাড় করেছেন, বাঙালির প্রিয় খাদ্য মাছ। স্বপ্নজয়ের পরে ৬৬ দিনের মাথায় আজ প্রিয় খাবার মাছ পেয়ে, খুশিতে রান্না করতে করতে বিপ্লব দাস, এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন ‘দ্য ক্যালকাটা মিরর’-এর পেজে। ক্যালকাটা মিরর-এর পক্ষ থেকেও থাকলো তার জন্য হার্দিক শুভেচ্ছা ও আগামীর জন্য অনেক শুভকামনা।
                                          লেখা – তানিয়া তুস সাবা।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    দেশে একধাক্কায় অনেকটা কমল করোনা সংক্রমন , বাড়ছে সুস্থতা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : স্বস্তি জাগিয়ে একধাক্কায় অনেকটা কমল দেশের দৈনিক সংক্রমণ। গত কয়েকদিন ধরে নিম্নমুখী দেশের করোনা...

    কাপড়ের মাস্ক পুরোপুরি আটকাতে পারবে না করোনা সংক্রমন , বলছে বিশেষজ্ঞরা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : করোনা ঠেকাতে মাস্ক আবশ্যক। একথা প্রথম দিন থেকে বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। উৎসবের দিনে বেশিরভাগ...

    পিছু ছাড়ছে না শীতের বৃষ্টি , তবে পরশু থেকে হাওয়া বদল

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : শীতেও পিছু ছাড়ছে না বৃষ্টি। মঙ্গলবারও মেঘলা আকাশ সঙ্গে দু-এক পশলা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে...

    রাজ্যে আরও কমল করোনা সংক্রমন , ঊর্ধ্বমুখী সুস্থতা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : একটু একটু করে সুস্থতার পথে বাংলা। এক ধাক্কায় অনেকটা কমল রাজ্যের সংক্রমণ। গত ২৪...

    কাদের ওমিক্রনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ? কি বলছে WHO

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ডেল্টার তুলনায় কম ক্ষতিকর, উপসর্গ মৃদু হলেও কিন্তু ডেল্টার তুলনায় কয়েক গুণ দ্রুত ছড়াচ্ছে...