32 C
Kolkata
Friday, September 30, 2022
More

    অমানবিক সংলাপ – ২ – আনন্দময় ভট্টাচার্য

    এ অবলাকান্তের বাল্যকালের অভ্যাস। এই একটি দিন আসিলে অবলাকান্তের মন গৃহাভ্যন্তরে স্থির মানিতে চাহে না। ঊষাকাল আসিতে না আসিতে তাহার ক্ষারধৌত শুভ্র ধুতি-ফতুয়ায় নিজেকে শোভিত করিয়া বাহির হওয়া চাই। ভিতর হইতে কোনো দেশপ্রাণ গাহিয়া ওঠে ‘বন্দেমাতরং সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং…।’ স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রভাত প্রকৃতির আদ্র মেদুরতা এক ভিন্নলোকে আকর্ষণ করিয়া লইয়া যায় অবলাকান্তকে। এই বৎসরেও তাহার ব্যত্যয় ঘটে নাই। বাহির হইয়াছিল কমলাকান্ত। সহসা শুনিল ‘ঘেউ’। স্বাভাবিক। সারমেয় নিনাদে অবাক হওয়ার কিছুই নাই। কিন্তু আরও একবার শব্দটি হইতেই অবলাকান্তের মনে হইল এটি ‘ঘেউ’ নহে। মানবিক কণ্ঠে কেহ ডাকিতেছে ‘কে ও!’ অবলাকান্ত ঘুরিল। পিছনে তিনটি সারমেয় ব্যতীত অন্য কোনো মনুষ্য গোচর হইল না। পূর্বরাত্রে তল্লাটের যুবকবৃন্দ রাজনৈতিক দলের হইয়া শ্রমদান করিবার পুরষ্কারস্বরূপ প্রাপ্ত অর্থে স্বাদীনতা দিবস উপলক্ষে যে ভোজনের আয়োজন করিয়াছিল, এবং অহরাত্র ডিজে ঝনৎকারসহ সে ভোজনের অনুপান হিসেবে বিপুল তামরস উদরস্থ করিয়া বিক্ষিপ্ত পড়িয়া ছিল, এই সারমেয়কূল উহাদের বমনসিক্ত মুখমণ্ডলে মুত্রত্যাগ করিয়া হৃষ্টচিত্তে দাঁড়াইয়াছিল। উপেক্ষা করিতে চাহিয়া অবলাকান্ত যখন ফিরিবে স্থির করিল, তখনই আবার শুনিল, ‘প্রশ্ন করলে উত্তর দাও না যে বড়ো!’ চমক লাগিল অবলাকান্তের। আজ স্বাধীনতা দিবস। এই একটি দিন সে সুরাপান থেকে নিজেকে নিবৃত রাখে। সে আজ কোন প্রভাবে এমন ভ্রান্তিবিলাসের মধ্যে পড়িতেছে বুঝিতে পারিতেছিল না। তখনই শুনিল মধ্যম সারমেয়টি মনুষ্যকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ‘অবাক হচ্ছো তো! কী করে আমরা মানুষের কণ্ঠে কথা বলছি তাই ভেবে!’ অবলাকান্ত সম্মতি জানাতে সেই মধ্যমজনই বলিয়া উঠিল, ‘সর্বোত্তম বিবেচনায় তোমরা যাদের হাতে তোমাদের শাসনভার তুলে দিয়েছ, তারা যদি জনসভার নামে প্রকাশ্যে কুকুরের ভাষা ব্যবহার করাটা সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পারে, তবে আমরা কেন মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারব না!’ অবলাকান্ত বুঝিল সারমেয়টির বক্তব্যে যুক্তি ভরপুর। সে বলিল, ‘সঠিক কথা। কিন্তু আমাকে ডাকলি কেন!’

    ‘প্রশ্ন আছে কয়খান’ উত্তর আসিল দক্ষিণ পার্শ্বের সারমেয়টির দিক হইতে।

    ‘বলে ফেল’ অবলাকন্তের কণ্ঠে উদ্বেগ।

    ‘ওরা কারা যারা বিলিতি সিগারেটে চুমু দিয়ে এই স্বাধীনতা মিথ্যা বলে প্রতিবছর হাঁক পারে?’ দক্ষিণ পার্শ্বস্থজনের প্রশ্ন।

    ‘আমরা ওদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বলে জেনে এসেছি ছোটো থেকে’ অবলাকান্তের উত্তর।

    ‘প্রতিবছর বলে, তবু সত্য স্বাধীনতার জন্য ওরা কী করে?’ একই জনের জিজ্ঞাসা।

    ‘অপেক্ষা। কবে সেই সকাল আসবে যেদিন দেখা যাবে নিজে নিজেই বিপ্লব হয়ে গেছে। দেশ দ্বিতীয় রাশিয়া হয়ে যেছে। শ্রেণি মুছে গেছে। জ্বল জ্বল করছে পার্টি গঠনতন্ত্র আর কর্মসূচি আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট।’ অবলাকান্তের নির্লিপ্ত উত্তর।

    ‘আর যারা ভারতমাতার মূর্তি গড়ে পূজা করছে, তাদের সম্বন্ধে কী মত তোমার?’ মধ্যমজনের প্রশ্ন।

    ‘ওরা ভারতমাতার পূজা করে বটে, কিন্তু মাতৃজাতির প্রতি কতখানি দরদ ওদের আছে, তা নিয়ে ওদের মধ্যে কয়েকজনের উদ্ভট পিতৃতান্ত্রিক কাজকর্মেই প্রশ্ন উঠে যায়। উপরন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে ওদের পূর্বজদের ভূমিকাও সন্দেহের ঊর্ধে ছিল না বলে জানি।’

    ‘ভালো বলেছ। আর ওরা কারা যারা ন্যাশানাল ফ্ল্যাগের রঙে মঞ্চ গড়ে সাদা জামাকাপড় পরে সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের কৃতিত্ব নিজেদের দলের বলে প্রচার করছিল!’ এইবার বলিয়া উঠিল বাম পার্শ্বের সারমেয়টি।

    ‘ওরা অনেকে। কেউ হাত তো কেউ সেই হাতের ফুল। স্বাধীনতার পর সত্তর বছর ধরে ওদের হাতেই ভারতের বস্ত্রতোলা হয়ে আসছে। মানে পতাকা উত্তোলন বলে যাকে ভালো ভাষায়।’

    ‘তুমি বেশ শ্লেষ করতে পারো। এখন বলো এরা কারা, যাদের মুখে আমরা কিছু আগেই রেচন ত্যাগ করেছি!’ এ প্রশ্নটিও মধ্যমজনের।

    ‘ইদানিং ওরাই ভারত মায়ের প্রকৃত সন্তান। একালে সর্বত্র ওরা ভাই নামে প্রচারিত হয়েছেন। একালে ওদের দশ অবতার বিদ্যমান। সেগুলি হল সিন্ডিকেট সখা, পার্টি পুঙ্গব, ধর্ম ধামালি, মিডিয়া মধুসূদন, পাড়া প্রতাপাদিত্য, মোদো মদন, লটারি লাট্টু, রঙিন রোমিয়ো, মরুৎ মোরগ ও বিশ্ব বোদ্ধা। এই সকল অবতারে এক বা একাধিক রাক্ষশ বধ হয়ে থাকে। এই যেমন সেন্ডিকেট সখায় বধ্য প্রমোটার, ডেভেলপার থেকে পলেস্তারা খসা বাড়ি সংস্কারেচ্ছু গৃহস্থ। পার্টি পুঙ্গব অবতারের শক্তি বহুমুখী। সরকারের উন্নয়ন গতিধারা থেকে নিয়ত কাটমানি খেয়ে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে চলেছে। এই অবতার যেমন বহুমুখী, তেমনি বিচিত্রগামী। সাধারণের পতিত বৈঠকখানাকে সে রাতারাতি ক্লাবঘরে রূপান্তরিত করতে পারে। আবার সেই ক্লাবঘরের জন্যে অনুদান এনে তাকে যেকোনো অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়ার উপযুক্ত অট্টালিকাতেও রূপান্তরিত করতে পারে। কোনো আইনই তার কর্মপদ্ধতির ক্ষেত্রে বাধা হয় না। শাসক দল বদল হলে তারও বহিরাঙ্গে রঙের পরিবর্তন আসে। এক অদ্ভুত কবজ এই অবতারে প্রাপ্তি ঘটে যা আইনের চোখকে প্রকৃতপ্রস্তাবে অন্ধ করে দেয়। ধর্ম ধামালি দ্বারা বধ্য হন ধার্মিক, ধর্ম নিঃস্পৃহ, ধর্ম বিরোধী সকলেই। এরা মন্দিরে গোরুর ঠ্যাং ও মসজিদে শুয়োরের টুকরো ফেলে তান্ডব বাঁধাতে পারে। ধর্মের নামে অর্থ সংগ্রহ করে ফুর্তি করতে পারে। রাস্তায় মাচা বেঁধে গোমাংস ভক্ষণের আসর পেতে ছদ্ম র‍্যাডিক্যাল সাজতে পারে। মিডিয়া মধুসূদনের প্রতাপ দেখা যাবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে। অষ্টপ্রহর এদের বাঁশি বাজছে সেখানে। তাদের প্রবল যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যাবে গুজব ছড়ানো, নকল অ্যাকাউন্ট নির্মাণ, মিম বানানো, এঁড়ে তক্কো করা ও গালাগালিতে। ঘরের কোণে বসে এরা বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ প্রশ্রয়বলে বলিয়ান পাড়া প্রতাপাদিত্যের যাবতীয় জারিজুরি অবশ্য নিজের বাসস্থান এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেখানের যাবতীয় অপকর্মে এই অবতারের অবদান থাকে। পাড়ার উঠতি কন্যেকূল এদের বিশেষ আকর্ষণের কারণ হয় এবং নানাভাবে উৎপাতের স্বীকার হয়ে থাকে। মোদো মদন অবতারে বধ্য সুরা, কাফসিরাপ, পাতা, ট্যাবলেট, আঠা, এমনকি নেশাপ্রদায়ী রাসায়নিক ও পারিবারিক সদস্যের কষ্টার্জিত অর্থ। এরা নেশাদ্রব্যের যোগানের নিমিত্তে যেকোনো অপকর্ম করার মানসিক সান্দ্রতায় অবস্থান করে। লটারি লাট্টু অবতারের সন্ধান কেবল ভাগ্যের প্রসন্নতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। প্রভাতেই পূর্বদিনের লটারির ফলাফল সম্বলিত ফ্যাক্সের প্রতিলিপি নিয়ে গবেষণায় উপবেশন করে। এদেরও বধ্য কষ্টার্জিত অর্থ। রঙিন রোমিও অবতারে বধ্য শালীনতা, দৃষ্টির আরাম ও রাত বিরেতে ঘরে ফেরা মেয়েরা। এই অবতার বিচিত্র বসন, রঙিন কেশ, অনুকরণকারী ফিল্মি ধরণের হয়ে থাকে। সমাজজীবনে বিস্তর উৎপাত মাঝেমধ্যে এদের দ্বারা সম্পাদিত হয়ে থাকে। মরুৎ মরোগ অবতার পূর্বের অবতারবৃন্দের মতো ক্ষতিকর হয় না। কিছুটা ধান্দাবাজ জাতের হয়। জমি বাড়ি সহ যেকোনো ক্ষেত্রে দালালি, অবিরাম পরনিন্দা পরচর্চা, লাগামহীন গুণিজনের অসম্মান, মায়ের কাছে মাসি ও বাপের কাছে পিসি সাজা ইত্যাদি কাজে এদের জুড়ি নেই। শেষ অবতারটি আকর্ষণীয়। বিশ্ব বোদ্ধা অবতার। এদের অজ্ঞাত কিছুই নেই। এরা কোয়ান্টাম ফিজিক্স থেকে রবীন্দ্রনাথ থেকে মাইকেল জর্ডন থেকে এলভিস প্রিসলে, সব বঝে। সব বিষয়ে মত দেয়। অতিমারির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চায়ের দোকানে যায় ও থুতনিতে মাস্ক পরে। এদের নাক কিছুটা কোঁচকানো ও নীচের ঠোঁট কিছুটা বামদিকে বাঁকা হয়ে থাকে। তোমরা এই অবতারকূলেরই কয়েকজনের মুখে হিসি করেছ।’ একনিঃশ্বাসে কথাগুলি বলিয়া অবলাকান্ত হাঁপ ছাড়িল।

    ‘তোমার মুখে একালের অবতার বৃত্তান্ত শুনে আমরা পরম পরিতোষ লাভ করেছি। আমাদের মধ্যে জার্মান শেফার্ড, ল্যাব্রাডর, পিট বুল, ম্যাস্টিফ, বক্সার, স্পিট, লাসা, লেরি ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্য আছে। তবুও আমরা এতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ নই, যতটা রকমারি তোমাদের অবতাররা। আমাদের ভুল হয়েছে এই প্রণম্য অবতারদের মুখে মুত্রত্যাগ করে। তোমাদের স্বাধীনতার সপ্তস্বরা বাজুক। আমরা এখন এলাম।’ বলিয়া তীব্রবেগে অন্তর্হিত হল সারমেয়কূল।

    সাউণ্ডবক্সের প্রবল আওয়াজে নিদ্রা ভাঙিয়া শয্যাপরে একেবারে নির্বুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিল অবলাকান্ত। এ কী হইয়াছে তাহার সঙ্গে! কোনো বৎসর যাহা হয় না, এ বৎসর ঘটিল কী প্রকারে! সে স্বাধীনতা দিবসের দিন বেলা পর্যন্ত নিদ্রাযাপন করিতেছিল! লজ্জা লাগিতেছে অবলাকান্তের। বাহিরে ডিজে বক্সে তারস্বরে বাজিয়া চলিতেছে ‘ভ্যান্ডে মাতরম… ভ্যান্ডে মাতরম…’

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    আমায় ঘুগনি করে দাও না মা গো বেচবো পুজোর প্যান্ডেলে

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : কয়েকদিন আগেই খড়্গপুরে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বেকার যুবক যুবতীদের কাজ...

    মঙ্গলে আলু চাষের সম্ভাবনা নিয়ে আশ্বস্ত করল পরীক্ষা

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : প্রতিদিন বিভিন্ন নিত্য নতুন আবিষ্কার করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। আর মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চোখ যেদিকে রয়েছে তা হলো মঙ্গল...

    সম্পত্তি-বৃদ্ধি মামলায় সুপ্রিম কোর্টে ১৯ তৃণমূল নেতার স্বস্তি।

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : অভিযোগ ছিল ২০১১ থেকে তৃণমূলের ১৯ জন নেতা মন্ত্রীর সম্পত্তির পরিমাণ বহুল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংক্রান্ত...

    পুজোর আবহে লাল হলুদ জার্সি উদ্বোধন

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : চতুর্থীর সুবর্ন সন্ধায় বসেছে চাঁদের হাট। তারকা খচিত সন্ধায় লাল হলুদের জার্সি উদ্বোধন...

    চলে গেলেন সব থেকে বেশী ডার্বি ম্যাচ খেলানো ফিফা রেফারী সুমন্ত ঘোষ

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : চলে গেলেন সবথেকে বেশিবার রেফারি হিসেবে ডার্বি ম্যাচ পরিচালনারও নজির সৃষ্টিকারী রেফারি সুমন্ত...