33 C
Kolkata
Sunday, September 25, 2022
More

    অমানবিক সংলাপ – ১ – আনন্দময় ভট্টাচার্য

    অমানবিক সংলাপ – ১

    করোনা মহামারীর উপর সাইক্লোন আমফানের খাঁড়ার ঘা। তিলোত্তমা কলকাতা কুপোকাত হইয়াছেন। ঝড় তিনদিন পূর্বে সন্ধ্যায় থামিয়াছে। কিন্তু তাহার পর হইতে এই মহল্লায় কোনও সন্ধ্যায় বিজলীস্পর্শিত আলো জ্বলেনাই। মহামতী সিইএসসি রাজতোষণে সসম্মানে জামানান্তরে উত্তীর্ণ হইতে পারিলেও এই বাস্তবিক পরীক্ষায় ডিস্টিংকশন সহকারে ফেল মারিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে কী! ছাপ্পান্ন ইঞ্ছির সুবিশাল বক্ষের রাজা মহাশয় সুরাপাত্রে বর্ণসঞ্চারের অনলাইন ব্যবস্থা বিধান করিয়াছেন। রাজ্যের ঝুলন্ত অর্থনীতির সৌজন্যে কেহই তাহাতে অমত করেননাই। তাহারই দু’এক পাত্র অবলাকান্ত আজ সংগ্রহপূর্বক পাকতন্ত্রে পাঠাইয়া মশগুল হইয়া সাহিত্যসম্রাটের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ পাঠ করিতেছিলেন। ঠিক এমনি সময় তাঁহার সম্মুখস্ত মোমবাতির পার্শ্বে, যেটির দাম আমফানের দোলা লাগিয়া এক সন্ধ্যাতেই কয়েকগুণ বাড়িয়াছে, ঠিক তাহারই পার্শ্বে উপবিষ্ট একটি ভাবুক পঙ্গপালের উপর অবলাকান্তের নজর নিবদ্ধ হইল। সুরার প্রভাবেই নাকি গ্রন্থের বিষয় প্রভাবে বলা যায় না, অবলাকান্ত স্পষ্ট শুনিলেন কিছু একটা লইয়া পঙ্গপালটি বিড়বিড় করিয়া কিছু একটা বলিবার প্রচেষ্টা করিতেছে। আওয়াজ ক্ষীণ হওয়ায় তাহা অবলাকান্ত ইস্তক পৌঁছাইতেছে না। অবলাকান্ত আপন কর্ণটি টেবিলের সমতলে রাখিতেই শুনিতে পাইলেন তীব্র হতাশাজড়িত কণ্ঠে পঙ্গপালটি বলিয়া উঠিল, ‘তুমি একটি পাক্কা হারামজাদা লোক আছো।’ অতর্কিত এই অপশব্দ শ্রবণে অবলাকান্তের নেশাজড়িত সারাটা শরীরে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। পঙ্গপালের সংহারকরণ হেতু একটা কিছু, নিদেনপক্ষে একটা খবরের কাগজ হাতের নিকট সন্ধান করিতে উদ্যত হইতেই অবলাকান্ত শুনিতে পাইল পঙ্গপাল বলিয়া চলিতেছে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মারতে চাইছো তো! তা তো চাইবেই! একা আছি, ছোটো আছি, তুমি বড়ো আছো, শক্তি আছে, তাই ধৈর্য তো কম হবেই! উপরন্তু মদ মারার পয়সা আছে এই সব-বন্ধের বাজারে! মারবে না! অসংঘটিত বিচ্ছিন্নরা তো বড়োদের হাতে মার খাওয়ার জন্যেই আছে!’ একটু থামল অবলাকান্ত। সত্যিই তো! যুক্তি আছে! ‘তাই বলে আমাকে খিস্তি করবি!’ অবলাকান্তের তরফ থেকে এই পাল্টা প্রশ্নটি পেয়ে পঙ্গপাল প্রথমে কিছু সময় চুপ করিয়া রহিল। তাহাররপর একটু কান্না ভেজা স্বরেই উত্তর করিল ‘তা কী করব! আজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। শুকনো খিস্তি ছাড়া তোমাদের আর কী করতে পারি! আমাদের খাদ্যের জায়গায় তোমরা স্তরে স্তরে মুনাফার ওষুধ দিয়ে রেখেছো। তোমাদের বিজ্ঞানের জোশ প্রকৃতিকে এমন বদলে দিয়েছে যে আমাদের খাদ্যাখাদ্যের কোনো ঠিক নেই। আমরা পরিযায়ী হয়ে গেছি। আমাদের নিজের কোনো ভুমি নেই তোমাদের অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষার ফলে। আমাদের খাদ্যের জন্যেই নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়তে হয়। প্রকৃতির প্রতিশোধে তোমরা বিপর্যস্ত হলেও আমাদের নিয়ে তোমাদের পরীক্ষা থামে না। আমরা নিজেদের স্থানে ফিরতে পারলাম বা খাদ্যের যোগান করে নিতে পারলাম কিনা তা জানার তোমাদের দরকার পড়ে না। তোমাদের কাছে তোমাদের খাবার ঘরে মন-মন কিলো-কিলো স্টক হয়ে গেলেই তোমরা সব কিছু অচল করে দাও। যেমন তোমরা নিজেদের জন্য এমন আগেও করেছিলে নোটবন্দীর সময়। কয়েকঘণ্টার নোটিশে আমাদের শূন্যতার মধ্যে ছেড়ে দিতে পারো তোমরা। কারন আমরা ছোটো এবং সবসময়ই সারপ্লাস। একসময় তোমরা সিদ্ধান্ত নাও আমাদের কোথাও নড়তে দেবে না। আমরা ছোটো, নড়তে না পারি মরতে পারি। তোমরা প্রানীহত্যা হচ্ছে ভেবে নয়, আগামী ভোটে বেগ পাবে ভেবে আবার আমাদের মাঠ খুলে ঢোকানোর চেষ্টা করো। ততদিনে আমাদের বুকে রোগ ঢুকে একাকার। তোমাদের একদল চক-খড়ি নিয়ে গোল পাকিয়ে লোক দেখায়, একদল গাছ কেটে লোক দেখায়। আর এক দলের কথা তো বললামই না, তিন দশক ক্ষমতায় থেকে ধর্ম মানি না ধর্ম মানি না করে পকেটে রাশিয়ার বই রেখে ঘুরল, রাজ্য থেকে কুসংস্কার অশিক্ষা দূর করতে পারল না। তারা আবার কেরলের উদাহরণ দেয়। তাদেরই কোনো একটা দলের প্রতিনিধি হবে তুমি। হারামজাদা বলব না তো দীনদয়াল উপাধ্যায় বলব? শুনে রাখো, আমরা ছোটো হতে পারি, অসংঘটিত হতে পারি, মাইলের পর মাইল উড়তে উড়তে আমাদের ডানা খুলে ঝুলে যেতে পারে, কিন্তু…’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু থামলো পঙ্গপালটি। অবলাকান্ত উদগ্রীব। ‘কিন্তু কী?’ পঙ্গপালের কণ্ঠ যেন হঠাৎ বদল হইল। সেখানে আর্তী নাই, কান্না নাই, আক্ষেপ নাই। একটা পাহাড়িয়া ডঙ্কার মতো বজ্রস্বর কাঠফাটা মাটির মতো চুরমার হইয়া পড়িল ঘরের কোণায় কোণায়, ‘কিন্তু যেদিন আমরা এক হয়ে আসব জবাব চাইতে, লাখ লাখ, কোটি কোটি তোমাদের বাড়ির ছাদে, জানলায়, আলসের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ছেয়ে যাব, সাবার করে দেব তোমাদের জমির ফসল, গাছের পাতা, ফল, টবের ফুল, সেদিন কিন্তু বোলো না তোমাদের ঐতিহাসিক ভুল ছিল আমাদের ছোটো ঘটনা মনে করাটা… আমরা আসছি।’

    এই বলিয়া পঙ্গপালটি গলিত মোমের পাশে স্থির হইয়া রহিয়া গেল। ‘মরে গেল নাকি!’ এই ভাবনা ভাবিয়া অবলাকান্ত আরও একটু নিকটবর্তী হইল ক্ষুদ্র ছায়াটির। এমন পরিস্থিতি এবং বচন শুনিয়া অবলাকান্তের নেশা একেবারে ছুটিয়া গেছে। সে স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করিল এতক্ষণ যাহাকে সে পঙ্গপাল জ্ঞান করিয়া সংলাপ করিয়াছে সেটি কোনোও মতেই পঙ্গপাল নহে, মোমবাতির আলোয় খানিক উল্লম্ব ভাবে অবস্থান করা রয়্যাল স্ট্যাগের ঢাকনাবিশেষ। অবলাকান্ত কপালদেশের ঘাম মুছিয়া পুনরায় বোতলের তলানিতে মনোনিবেশ করিল। বাইরের স্তব্ধ হাওয়ায় স্পষ্ট শোনা যাইতে লাগিল বহু পতঙ্গের পক্ষসঞ্চালনের নিনাদ।

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    পেলে ম্যাচের ৪৫ বছর বর্ষ পূর্তি প্রসূনের উদ্যোগে বিশেষ আড্ডা

    দ্য ক্যালকাটা মিরর : ফুটবল সম্রাট কিংবদন্তি পেলের বিরুদ্ধে খেলে, ৪৫ বছর আগে এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে ইডেন উদ্যানে...

    শেষ বার লর্ডসে টস করলেন প্রাক্তন অধিনায়ক ঝুলন

    টস করলেন প্রাক্তন অধিনায়ক ঝুলনলর্ডসে থামল চাকদা এক্সপ্রেস, ঝুল-‌দির বিদায়ে চোখে জল হরমনপ্রীতদের দ্য ক্যালকাটা মিরর : ছেলেদের এবং...

    সমবেত গীতা পাঠ , মন্ত্রমুগ্ধ বিশ্ব

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : সমবেত গীতা পাঠে বিশ্ব রেকর্ড। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট সংস্কৃত উচ্চারণে একসঙ্গে গীতাপাঠ করল...

    চোখে জল, মুখে হাসি! বিদায়বেলায় ফেডেরারই ‘রাজা’

    দ্য ক্যালকাটা মিরর : ফেডেরারকে ঘিরে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটল লেভার কাপে। নাদাল, জোকোভিচদের কাঁধে চড়ে বিদায় নিলেন ফেডেরার।...

    বার্লিন ম্যারাথনে নামছেন কাকা

    বার্লিন ম্যারাথনে নামছেন কাকাব্রাজিল ফুটবল তারকা কাকার বাবাও হাঁটবেন ম্যারাথনে দ্য ক্যালকাটা মিরর : বার্লিন ম্যারাথনে দেখা যাবে কাকার...