19 C
Kolkata
Monday, December 5, 2022
More

    আপনাকে রাষ্ট্রপতি করলে আমাদের চলবেনা, প্রণববাবুকে বলেছিলেন সনিয়া – দেবারুণ রায়

    (দেবারুণ রায়, বাংলা সংবাদ মাধ্যমের একজন উল্লেখযোগ্য নক্ষত্র। পেশাগত কারণেই তাঁর সাথে স্বর্গীয় প্রণব মুখার্জী’র সম্পর্ক দীর্ঘ ৩৫ বছরের। শুধু পেশা নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রণব মুখার্জী ছিলেন তাঁর দাদা তুল্য। অনেক কাছ থেকেই প্রণব মুখার্জীকে দেখেছেন দেবারুণ বাবু। আর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি’র মহা প্রয়াণের পর দেবারুণ রায়ের কলমে উঠে আসছে অনেক না জানা প্রণব স্মৃতি। যা ধারাবাহিকভাবে শুধুমাত্র দ্য ক্যালকাটা মিররে প্রকাশিত হবে। আজ রইল সেই ধারাবাহিকের দ্বিতীয় কিস্তি।)

    কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জোট ভারতের রাজনীতিকে চিরদিনই আরও রংবাহারি করে তুলেছে। একেবারে আদিকালের অনায়াস নির্বাচন ছাড়া। নেহরু যখন মধ্যগগনে সেসময় ধারে বা ভারে কংগ্রেসের ধারেকাছে আর কেউ ছিলনা। আবার রাজীব জমানায় কংগ্রেসের যুগান্তকারী ৪১০ এর লোকসভায় জোট ছিল জাতীয় স্তরে বিরোধীদের কষ্টকল্পনা। কিন্তু মধ্যেখানে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সর্বঅর্থেই আগ্রাসনের ইতি ও নেতিবাচক রূপ দেখেছে ভারতবাসী। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের প্রথম বিভাজন ছিল জাতীয় রাজনীতির মোড় ঘোরানোর সংকেত । কংগ্রেসের দলীয় প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডিকে হারাতে খোদ প্রধানমন্ত্রী যে তোপ দেগেছিলেন তা সেদিনের পটভূমিতে সদর দপ্তরে কামান দাগার চেয়ে কম কিছু ছিল না। বকলমে তাঁর প্রার্থী ভিভি গিরি বামপন্থীদেরও ভোট পেয়েছিলেন। তার অনেক পরে ড. শঙ্করদয়াল শর্মা রাষ্ট্রপতি হলেন বামভোট নিয়েই। এবং বামফ্রন্টে একটি ছোট দল রীতিমতো বেঁকে বসল। সমদূরত্বের শ্লোগান তুলে তারা মনে মনে জানিয়ে দিল, যেন তারাই লেনিন। সিপিএমের প্রকাশ কারাটের মত কট্টর কংগ্রেস বিরোধী নেতাও শেষ পর্যন্ত আরএসপিকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যাতে ওই কৌশলগত আঁতাতেও বাম ঐক্য অটুট থাকে। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। অথচ, ইতিহাসের কী পরিহাস। সেই আর এস পি এখন কেরলে কংগ্রেসের জোটে। আর বাংলায় বিপ্লব স্পন্দিত বুকে তারাই বাম-কংগ্রেস জোটপ্রার্থী অধীর চৌধুরির বিরুদ্ধে গোঁজ। অথচ সর্বভারতীয় দলের নেতা বঙ্গজ মনোজ। কেরলে কংগ্রেসের এবং বঙ্গে সিপিএমের বিশ্বস্ত কমরেড। নিপাতনে সিদ্ধ বাম।

    ইন্দিরা গান্ধী ও প্রণব মুখার্জী

    তবে শঙ্করদয়াল শর্মা রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন অনায়াসেই। তাছাড়া, কে.আর. নারায়ণনকে তো উপরাষ্ট্রপতি করার সময় থেকেই দলিত উত্থানের মন্ত্রে ও ধর্ম নিরপেক্ষতার তন্ত্রে, ভিপির নেতৃত্বে বামেরাই ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে ভার্চুয়াল জোটের হোতা। তখনও তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের শাসক কংগ্রেসেই। এবং কংগ্রেস তখনও বাংলায় সিপিএমের বি টিম ঘোষিত হয়নি।

    আব্দুল কালামের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় হরকিষেন সিং সুরজিৎয়ের উদ্যোগে গড়া পিপলস ফ্রন্ট রাতারাতি ভেঙে বাজপেয়ীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন মুলায়ম। এবং তাঁর পিছু পিছু আঞ্চলিকরাও। সেবার রামবাণ মেরেছিলেন অটল, মুলায়মের কাঁধে বন্দুক রেখে ও যাদবকূলপতির প্রস্তাব মেনে নিয়ে। প্রণববাবুর রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ার সময় সেই কালামকেই উপলক্ষ্য করে মুলায়ম মমতাকে যে গোলকধাঁধায় রেখেছিলেন কয়েকদিন, তার কারণ আজও কেউ সঠিকভাবে জানেকি ? জানতেন অবশ্যই প্রণব চাণক্য মুখোপাধ্যায়।

    এপিজে আবদুল কালামকে দ্বিতীয় মেয়াদ দেওয়ার উদ্যোগ দু দুবার বিফলে যায়। মুলায়মের মনের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও বিতর্কিত সময়ের আলোছায়ায় জড়িয়ে পড়েন এই প্রজ্ঞাবান অরাজনৈতিক তামিল শিক্ষক-প্রযুক্তিবিদ। মেরুকরণের রাজনীতির রামধাক্কা না থাকলে সর্বসম্মত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি হয়ত তিনটে মেয়াদও থাকতে পারতেন। কিন্তু গুজরাতের ঘটনায় ২০০১-এর পর মেরু রাজনীতির যে পূর্ণগ্রাস দেখল ভারতবর্ষ, তার ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও তার বাইরে থাকতে পারলনা। গুজরাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই প্রথিতযশা রাষ্ট্রপতির ভূমিকাও গণতন্ত্রের রাডারে ভেসে উঠল। প্রশ্ন উঠল, কে.আর. নারায়ণন তাঁর সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে থেকেই সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার বিরুদ্ধে যে কড়া অবস্থান নিতেন, কালাম কি তা নিতে পেরেছেন? কোনও ভাবেই কি বিনাশকালে সংবিধান স্মরণ করিয়েছেন সেদিনের দণ্ড মুণ্ডের কর্তাদের? বারবার এই প্রশ্ন সেদিন পথ খুঁজেছে রাজধানীর ক্ষমতার অলিন্দে।

    মমতা ব্যানার্জী ও প্রণব মুখার্জী

    বিজেপি ও কংগ্রেসের সম্মিলিত সমর্থনে নির্বাচিত হয়েও রাষ্ট্রপতি কালাম মেরুর ঊর্ধ্বে থাকতে পারেননি। কালামের পর কংগ্রেসের নেত্রী প্রতিভা পাটিল রাষ্ট্রপতি হলেন। প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপত। সঙ্গে এল বামেরা এবং এনডিএতে ফাটল ধরল সেবারের রাষ্ট্রপতির ভোটেও। শিবসেনা জোটের বোঝাপড়া থেকে বেরিয়ে এসে ভোট দিল কংগ্রেস প্রার্থীকে। ইউপিএ অটুট থাকল। সেবারই কংগ্রেসের কেউ কেউ প্রণব মুখোপাধ্যায়কে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম ইউপিএর শেষদিকে প্রণববাবুকে ছাড়া সরকার চালানোর ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব ছিল সনিয়া বা মনমোহনের। তাই প্রতিভা পাটিলকে মনোনয়ন দেওয়ার আগেই এনিয়ে আলোচনার অবসরে কংগ্রেস সভানেত্রী তাঁকে পাশে বসিয়ে বললেন, ” প্রণবজি, উই জাস্ট কান্ট অ্যাফর্ড টু লিভ ইউ ফর রাইসিনা হিলস্। (আপনাকে আমরা রাষ্ট্রপতি ভবনের জন্য সঁপে দিতে পারবনা। ) সরকার, ইউপিএ, লোকসভা পরিচালনা, শরিক, দল, ও সরকারের দৈনন্দিন সমন্বয়ের এই দুরূহ কাজ কে দেখবে? আপনি যদি এনিয়ে কিছু ভেবেও থাকেন তাহলেও আমি বলব, আমরা আপনাকে রাষ্ট্রপতির জন্য ছেড়ে দিতে পারবনা। ওই সুউচ্চ আলংকারিক পদের জন্য কাউকে নিশ্চয়ই খুঁজে নিতে পারব আমরা। কিন্তু আপনার শূন্যস্থান কে পূরণ করবে? “

    দাদা সেদিন একটু হলেও থমকে গিয়ে ভেবেছিলেন কিছুক্ষণ। কারণ দলের উঁচুতলায় তাঁর প্রতিপক্ষের কৌশলটাই অনেক সময় ছিল এরকমই। সনিয়া যেটা বোঝাতে চেয়েছেন তাতে কোনও ছদ্মবেশ নেই। কিন্তু প্রশংসার আড়ালে তাঁকে টেনে ধরার মত কৌশলে পটু কেউ কেউ আর অপরিচিত নন। যদিও এই ক্ষুদ্র পথের পথিক না হলেও সারাজীবন নিজের অধীত দক্ষতা ও বোধের তীক্ষ্ম তিরে লক্ষ্যভেদ করেছেন প্রণব।

    সামান্য একটা সময়ের পরিধি ছাড়া এই দীর্ঘ জনজীবনে পঁচানব্বই ভাগ কালখণ্ড কেটেছে শীর্ষপদে, অপরিহার্য হয়ে। ইন্দিরা থেকে রাজীব, নরসিংহ থেকে মনমোহন এই বিস্তীর্ণ পর্বের কিছুটা সময় রাজীবের কোরগ্রুপে ছিলেন না ঠিকই। কিন্তু ওঁকে দলে ফিরিয়ে নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করেছিলেন রাজীব গান্ধী। কারণ রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অভিযাত্রীর মতো উদিত, স্বচ্ছ ও সহজে বিশ্বাস করার মত বিরল শ্রেণির উদার মানুষ রাজীব তখন স্তাবক পরিবৃত দলে হাঁপিয়ে উঠেছেন।

    নতুন করে দলে ফেরানোর পর এআইসিসির পরিকল্পিত সদর দপ্তর জওহর ভবনে প্রণববাবুকে একটা ঘর দেওয়া হয়েছিল, সংগঠনের কিছু রিপোর্ট ও গবেষণাভিত্তিক কাজ করার জন্য। অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর সেই দায়িত্বও এতটা নিষ্ঠা ও বিরল দক্ষতার সঙ্গে পালন করছিলেন যে রাজীবের সঙ্গে তাঁর সংযোগ বাড়ছিল। রাজীব দেখছিলেন, এই একটা লোক দলের দোষ ত্রুটি ব্যর্থতার দিকগুলো অকপটে নিরাসক্ত ভাবে তুলে ধরছেন। নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সঠিকভাবে সমাধানের পথ বাৎলে দিচ্ছেন। কিন্তু সেসব তথ্য বাইরে ফাঁস করছেন না। দলের মঞ্চে সরব। কিন্তু বাইরে উল্টে সমস্ত অভিযোগ খণ্ডন করে বিরোধী দলগুলোর যুক্তিতে জল ঢেলে দিচ্ছেন। দলের সংগঠনে ও প্রশাসনে এমন লোকের সাহচর্য পেয়ে যথেষ্ট অভিভূত রাজীব একদিন একা প্রণববাবুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি অতীতের মূল্যায়ন সংশোধন করেছেন। কাজে তা প্রমাণ করতে চান। ওঁর প্রতি রাজীবের নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছিল। দলে কাজ ও দায়িত্বও বাড়ছিল। কাজে ডুবে থাকা মানুষ ছিলেন। এক দশকেরও বেশি জনজীবনের ও প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতার পর দলের নতুন ওই পুরস্কার বিহীন নেপথ্যচারীর কাজেও ডুবে থাকতেন দুপুর থেকে অনেকটা রাত পর্যন্ত। সেটা ছিল ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের মোড় ঘোরার মৌসম। আরও সঠিকভাবে বললে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নবনির্মাণের দিনে যুগপৎ কালো ও আলোর বছর।

    তখন মাত্র প্রায় দুবছর সাউথ, নর্থ ব্লকের বাইরে কংগ্রেস। ভিপি সিং সরকারের এগার মাসের পর চন্দ্রশেখরের চারমাসের শেষ অংক চলছে। চারমাসের সরকারের চালিকাশক্তি কংগ্রেস। উত্তর প্রদেশে রামরথের দাপটে ক্ষীণ হলেও, সারাদেশে , বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের বড় সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে কংগ্রেস, রাজীব ফের প্রধানমন্ত্রী হয়ে অতীতের ভুল শুধরে নিয়ে দলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাবেন, এই স্বপ্নই কংগ্রেসিদের চোখে। যদিও জনতাদলের মণ্ডলপন্থার জয়যাত্রায় সারাদেশে চষে বেড়াচ্ছেন ভিপি। লড়াইয়ের লক্ষ্যে আডবাণীর রাম রাজনীতি। জওহর ভবনের চার দেয়ালের মধ্যে বসে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মূল লক্ষ্য তখন মণ্ডল , কমণ্ডলের কব্জা থেকে উত্তর প্রদেশের ও জাতীয় রাজনীতির পরিমণ্ডলকে মুক্ত করতে কংগ্রেসের চিরায়ত মূলস্রোতটিকে স্রোতস্বিনী করে তোলা। তখন তাদের মূল কোহিনুর যে আর কিছুদিনের মধ্যেই হারিয়ে যাবে আততায়ী মানববোমার আগ্রাসনে তা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। উথালপাতাল উন্মেষকাল তখন।

    মনমোহন সিং, প্রণব মুখার্জী ও সনিয়া গান্ধী

    একদিকে জঙ্গি হিংসা । অন্যদিকে বদলে যাওয়া ভোটের অংকের দুদিকে পিছড়ে বর্গের “সত্তামে হিস্সেদারি” আর ধর্মীয় মেরুকরণ। কংগ্রেস ফিনিশ হতে হতেও হলনা। ভোটের মধ্যেই রাজীব হত্যার ঘটনায় নির্বাচনী সুইং একেবারে উল্টো স্রোতে ভাসিয়ে দিল কংগ্রেসের বিরোধীদের। অন্য উজানে পাড়ের নাগাল পেল কংগ্রেস। পরিবার ও দলের নেতৃত্বের সমস্ত সমীকরণ মুছে দিয়ে ধংসস্তুপ থেকে ফিনিক্স হয়ে উঠে এলেন অন্য নেতা, অন্য ঘরানা, অন্য সংস্কার, ভিন্ন রাজনীতি, অর্থনীতি ও অনেকটাই পরিবর্তিত যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো রণনীতির হাত ধরে। দলের কর্মসূচি পরিবর্তনের সারথী প্রধানমন্ত্রী পি.ভি নরসিংহ রাও তাঁর রাজনৈতিক রথের ঘোড়া করলেন অর্থনীতিকে। যার প্রবক্তা তাঁর অরাজনৈতিক অর্থমন্ত্রী ড.মনমোহন সিং। যিনি অর্থশাস্ত্রী , দেশে বিদেশে সুপরিচিত আমলা ও কেইনসীয় অর্থনীতিতে সুপণ্ডিত। প্রধানমন্ত্রী রাও তাঁর দীর্ঘদিনের অনুজ বন্ধু প্রণবকে মন্ত্রী করার ঝুঁকি নিলেন না সংসদে জিতিয়ে আনার কথা মাথায় রেখে। কিন্তু সরকারে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক পরিচালনায় ও যুক্তরাষ্ট্রীয়তার সফল প্রয়োগে প্রণবের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে তাঁকে যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান করলেন। যিনি পদাধিকারে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের বৈঠকে হাজির হতেন। প্রধানমন্ত্রী হতেন এখন লুপ্ত সেই যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান। সে রামও নেই। নেই সে অযোধ্যাও। পরে ফিরব এ প্রসঙ্গে।

    আপাতত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সেই ভুলভুলাইয়ার উপকথায় ফিরতেই হবে। লখনউ যাঁকে বারকয়েক মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে দেখেছে। হিন্দিহৃদয়ের পিছড়ে বর্গের উত্থানের অন্যতম নায়ক, জোড়তোড়ের তুখোড় তিরন্দাজ বলে খ্যাত, অনেক নাটকীয় রাজনীতির রূপকার মুলায়ম সিং যাদব লখনউয়ের বিখ্যাত ভুলভুলাইয়ারই রাজনৈতিক সংস্করণটি জনসমক্ষে হাজির করলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেসের তরফে প্রণববাবুর নাম ঘোষণার আগেই। মুলায়ম ও বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা, তৃণমূলের সুপ্রিমো যৌথ সাংবাদিক বৈঠক ডেকে ঘোষণা করলেন, “প্রণব মুখোপাধ্যায় নন, আমাদের পছন্দের প্রার্থী হতে পারেন, আব্দুল কালাম , অথবা মনমোহন সিং, কিংবা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়।” মুহূর্তের মধ্যেই ব্রেকিং নিউজের বার্তা রটি গেল ক্রমে। প্রণবে নয়, মমতা, মুলায়মের আস্থা আব্দুল কালামে।

    মুলায়াম সিং যাদব ও প্রণব মুখার্জী

    পরদিন সকালে প্রথমে ‘দাদা’র সঙ্গে এবং পরে সনিয়াজির সঙ্গে দেখা করলেন মুলায়ম। দাদাকে নতুন কিছু বলার ছিল না। “রাজনীতির কথাবোঝাতে হয়না দাদাকে।” মুলায়ম বললেন। “পাছে সনিয়া আরও দেরি করেন দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ঘোষণা করতে, তাই এই ব্রেকিং নিউজের দাওয়াই। ইসমে কোই ডিল নহি। ব্যাপারি ডিল করতে হ্যায়, নেতাকা কাম রাজনীত। আর ডিসিশন।” লখনউ ফিরে গিয়ে দলের কর্মীদের সভায় মুলায়ম এই কথাই বললেন। বললেন, “প্রণব দাদা গোড়া থেকেই আমার প্রথম পছন্দ। কিন্তু কংগ্রেস খুব দেরি করছিল। ভাবলাম, দলের সবাই হয়তো একমত হতে পারছেনা। তাই কালাম সাহাবের নাম বলেছি। মমতা দিদি বলেছেন,মনমোহন ও সোমনাথবাবুর কথা।”

    আসলে তৃণমূল শিবির থেকেই অনেকে বলছিলেন, মুলায়ম বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু মুলায়ম এই রাজনৈতিক চাল এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন । এখানেই রাজনৈতিক ভাষ্য পৃথক। অন্যদিকে, তখন বিজেপি আরএসএসের প্রভাবশালী রাজনাথ সিংয়ের তৃণমূলের সঙ্গে আগাগোড়াই সুসম্পর্ক। তিনি প্রণববাবুর নাম আসবে জেনেই সর্বসম্মত নির্বাচন রোখার পথ খুঁজতে থাকেন। ইউপিএ শরিকদের ও বাজিয়ে দেখে বোঝেন, কার কোথায় অসন্তোষ। কংগ্রেস নেতৃত্ব শরিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেরি করে কাউকে ক্ষুব্ধ করেছেন। তাছাড়া বাংলায় কংগ্রেসের সঙ্গে তিক্ততার সম্পর্ক তৃণমূলের পক্ষে লাভজনক। বরং সংখ্যালঘু সমর্থনভূমি সংহত হবে কালামের মতো কেউ এলে। অন্য দিকে মনমোহনের নাম নেওয়ার কারণ, প্রস্তাবক হতে পারবে তৃণমূল। কংগ্রেসের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার দরকার হবেনা। উল্টে তাদেরই প্রস্তাব

    মানতে বাধ্য হবে কংগ্রেস। যার পরিণামে নতুন প্রধানমন্ত্রীও খুঁজতে হবে কংগ্রেসকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিক্ততা বেড়েছে দুই শরিকে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন,”আমরা মোর্চা ছাড়ছিনা। তবে ওরা যেকোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ।”

    সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাসের এই পর্বের শেষ অংক কিন্তু মিলনান্তক। এবং এই কমেডিতে এক বিন্দু মেলোড্রামা নেই। কারণ, শেষ অংক শুরু হয়েছে কালাম সাহেবের ঘোষণা দিয়ে। তিনি সাফ বলেছেন, সর্বসম্মতি ছাড়া তিনি আর রাষ্ট্রপতির দৌড়ে নেই। একথা জেনে এবং মুলায়মের একতরফা ঘোষণা শুনে সাংবাদিকদের সামনে তাঁর সিদ্ধান্ত ও তার কারণ দর্শালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন , “প্রণব মুখোপাধ্যায়কেই আমরা ভোট দেব। কারণ আমাদের আর কোনও বিকল্প পথ নেই। আমরা কালাম সাহেবের কথা বলেছিলাম। উপ রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন আমাদের কৃষ্ণা বসু।

    প্রণব মুখার্জী

    সবচেয়ে ভালো হতো কালাম রাজি হলে। কিন্তু তা যখন হলনা তখন আমাদের সামনে দুজন। ইউপিএ প্রার্থী হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও পূর্ণ সাংমা। তিনি এনডিএ প্রার্থীও নন। শুধু বিজেপির। এক্ষেত্রে আমরা ভোটদানে বিরত থাকতে পারতাম। কিন্তু আমাদের ৫০,০০০ভোট ছাড়াও প্রণববাবুর জিততে কোনও সমস্যা নেই। এই অবস্থায় অন্য পথে না গিয়ে আমরা প্রণবদাকেই ভোট দেব। এটা কোনও ব্যক্তি ফ্যাক্টর নয়। ডিল নয়। তার প্রশ্নই অবান্তর। শুধুমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। উপরাষ্ট্রপতি পদে হামিদ আনসারিকেও আমরা ভোট দেব। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করেছিলেন। ওঁর অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত। প্রণববাবুকে সমর্থনের কথাও তাঁকেই জানিয়েছি।”

    কংগ্রেসের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সরাসরি কেউ ভোট না চাইলেও মুখপাত্র বলেছিলেন, ঠিকই ভোট দেবেন উনি ইউপিএ প্রার্থীকে। অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কথা ছিল,” মমতাদিদি নিশ্চয়ই বাবাকে ভোট দেবেন। এটা কংগ্রেসের পক্ষে নয়, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছেলে হিসেবে বললাম।” আর এই বিপুল তরঙ্গে তিনি ছিলেন নিস্তরঙ্গ। শান্ত সমাহিত ছিল তাঁর অন্তরের মাঝসমুদ্র।

    (চলবে)

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    নজিরবিহীন ঘটনা , অশোকনগরে বৃদ্ধ দম্পতির ঘরে জন্ম নিল ফুটফুটে সন্তান

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : স্বামীর বয়স প্রায় ৭০ বছর আর তার স্ত্রীর বয়সও পঞ্চাশের বেশি। বৃদ্ধ এই দম্পতির...

    বাজিমাত করল ভারতীয় অর্থনীতি , অনেক পিছিয়ে চীন

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ফের বাজিমাত করল ভারতীয় অর্থনীতি। সরকারি ভাবে প্রকাশিত হল চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় কোয়ার্টারের বৃদ্ধির...

    গুজরাটে ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে বিজেপি , উত্থান আপের ! বলছে বিভিন্ন রিপোর্ট

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করবে BJP। প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা রিপোর্ট জানাচ্ছে, দুই...

    রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর , বড়দিনে বাড়তি মিলবে ছুটি

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : বড়দিনে বড় আনন্দ। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিরাট সুখবর। ২৬ ডিসেম্বরও ছুটি পাবেন রাজ্য...

    বঙ্গে শক্তি প্রদর্শনে RSS ! লম্বা সফরে মোহন ভাগবত

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ৫ বছর পরে কলকাতায় প্রকাশ্য সমাবেশ করতে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। আগামী ২৩ জানুয়ারি...