31 C
Kolkata
Tuesday, October 4, 2022
More

    গৃহবন্দি সনৎ শেঠের সঙ্গী এখন ক্রাচ – নির্মলকুমার সাহা

    তাঁর এখন ‘‌মন-‌মেজাজ ভাল নেই’‌। পায়ের কম-‌বেশি সমস্যা তো সেই ১৯৫২ সাল থেকেই। তখনও ২৪ পরগনা ভেঙে দু’‌টুকরো হয়নি। ওই সময় ২৪ পরগনা জেলা ফুটবল লিগ ছিল জমজমাট। কলকাতার বড় দলের অনেক তারকাই খেলতেন ২৪ পরগনা জেলা ফুটবল লিগে। ওই লিগে সনৎ শেঠ খেলতেন নিজের পাড়ার ক্লাব পানিহাটি স্পোর্টিংয়ের হয়ে। ওঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু কেষ্ট পালের দল ছিল শ্যামনগর যুগের প্রতীক। সেবার ওই ২৪ পরগনা জেলা লিগে ওই দুই দলের খেলায় কেষ্ট পালের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে পায়ে গুরুতর চোট পান সনৎ শেঠ। চোট সারিয়ে পরে দীর্ঘদিন ফুটবল খেললেও তখন থেকেই ডান পা বাঁকা। খেলতে খেলতে তারপরও টুকটাক পায়ে চোট পেয়েছেন। সেসব উপেক্ষা করেই খেলে গিয়েছেন, গোলকিপিং করেছেন বছরের পর বছর, ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু বার্ধক্যে পৌঁছে পায়ের সেই সমস্যা বড্ড বেশি ভোগাচ্ছে। অনেক বছর হয়ে গেল, ক্রাচকে সঙ্গী করেই তিনি বেঁচে আছেন। ক্রাচ বা অন্য কারও সাহায্য ছাড়া হাঁটা তো দূরের, দাঁড়াতেই পারেন না। পানিহাটির বাড়িতে বন্দি। ৮৭ বছর বয়সে পৌঁছে, একদা হাসি‌ঠাট্টা-গানবাজনা-‌মজায় মেতে থাকা মানুষটির এখন উপলব্ধি, ‘‌একসময় বেঁচে থাকতে ভাল লাগত। জীবনটা উপভোগ করতে চাইতাম। কিন্তু এখন আর ভাল লাগে না। এভাবে প্রায় মরে গিয়ে কে বেঁচে থাকতে চায়?‌ আমার জন্য অন্যরা কষ্ট পাচ্ছে। এভাবে সবাইকে কষ্ট দেওয়ার কোনও মানে নেই।’‌

    প্রৌঢ় সনৎ শেঠ ।

    সাম্প্রতিক সময়ের দু’‌টি মৃত্যুও ওঁর ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছে। বলছিলেন, ‘চুনী, প্রদীপও চলে গেল!‌ বয়সে একটু জুনিয়র হলেও একসঙ্গে খেলেছি। চুনী অনেকটাই জুনিয়র ছিল। ঘরে বসে খবর শুনছিলাম। চুনীর মৃত্যুর খবর শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।’‌ ‌গত বছর মে মাসে স্ত্রীর মৃত্যুর পর এখন পুত্র, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে নিয়ে সংসার।

    ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৮, টানা ২০ বছর কলকাতার মাঠে চুটিয়ে ফুটবল খেলেছেন। বিভিন্ন সময়ে ইস্টার্ন রেল, এরিয়ান, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের গোলরক্ষা করেছেন। তারই মাঝে খেলেছেন বাংলা, ভারতের হয়ে। ১৯৫৪-‌র ম্যানিলা এশিয়ান গেমসে ভারতীয় দলে থাকলেও প্রথম একাদশে সুযোগ পাননি। খেলেছেন তখনকার চতুর্দলীয় প্রতিযোগিতায় পরপর দু’‌বার ভারতের হয়ে। ১৯৫৫-‌য় রাশিয়া সফরেও গিয়েছিলেন।

    যুবক সনৎ শেঠ ।

    বাড়িতে বন্দিজীবনে মনে পড়ে অনেক সতীর্থর কথা। যাঁদের কেউ কেউ এখনও বেঁচে, অনেকে প্রয়াতও। বলছিলেন, ‘‌বদ্রুর (‌সমর ব্যানার্জি)‌ সাথে অনেকদিন দেখা, কথা হয় না। আগে যখন মাঠে যেতাম, গল্প করতাম। বলরামকেও কতদিন দেখিনা। বলরাম খুব ভাল মানুষ। আমেদ, সাত্তার, মান্নাদারা তো বেঁচে নেই!‌ ওরা বয়সে আমার চেয়ে বড় ছিল। তবু ওদের সঙ্গে আমার কত স্মৃতি।’‌‌ পুরনো দিনের স্মৃতিতে ডুবে বললেন, ‘‌ভাল খেলে যেমন প্রশংসা পেয়েছি। আবার ইট-‌পাটকেলও খেয়েছি। ওভাবেই সনৎ শেঠ হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। নিজেকে আমি সবসময় মাঠের মালি মনে করতাম। মাঠকে ভালবাসতাম। এখন তো আর মাঠে যেতেই পারি না!‌ ভেটারেন্স ক্লাবের এক অনুষ্ঠানেই মনে হয় শেষ মাঠে যাওয়া। সেটাও অনেক বছর আগে।’‌

    পায়ের সমস্যা ছাড়া ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলকিপার সনৎ শেঠের অন্য কোনও রোগ নেই। স্মৃতি শক্তিও প্রখর। টুকটাক যেটুকু সমস্যা তা বয়সের কারণে। যেমন এককথা বারবার বলে ফেলেন। ফোনে কথা বলতে বলতে সেটা টের পাচ্ছিলাম। পাশাপাশি টের পেলাম, এখনও তাঁর সঙ্গীত প্রীতি রয়েছে। কথা বলতে বলতেই গান গাইতে শুরু করলেন। বিছানায় বসে বা শুয়ে এখনও নিয়মিত গান শোনেন। গান শুনতে শুনতে নিজেও গলা মেলান। টিভিতে খেলা দেখেন। আবার কখনও রেডিওয় খেলার ধারাভাষ্য শোনেন। সনৎ শেঠ বললেন, ‘‌ওঠাবসায় সমস্যা। টিভি চালানোর জন্য উঠতে পারি না। বৌমা, নাতনিরা চালিয়ে দেয়। ছেলে, বৌমা, দুই নাতনি সবসময় আমার যত্ন নেয়। কিন্তু ওদেরও তো কাজ আছে। তাই সবসময় ডাকতে চাই না। তখন হাতের সামনে থাকা রেডিও চালিয়ে নিই।’‌

     ‌‌‌‌‌

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    ভারতে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কের মধ‍্যে বাড়ছে হার্ট অ‍্যাটাকের আশঙ্কা , বলছে সমীক্ষা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ভারতে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কের মধ‍্যে হার্ট অ‍্যাটাকের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে। ‘কার্ডিয়োলজিক‍্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’-র সাম্প্রতিকতম...

    দেখে নিন বিজয়া দশমীর নির্ঘণ্ট , জানুন এই দিনটির মাহাত্ম্য

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : অসত্যের ওপর সত্যের জয়ের উৎসব বিজয়াদশমী। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিটি বিজয়া দশমী...

    হিন্দু মহাসভার পুজোয় মহিষাসুর রূপে গান্ধীজী ! তুঙ্গে জোর বিতর্ক

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : কলকাতা-সহ সারা রাজ্য জুড়ে বিরাট ধুমধাম করে পালন করা হচ্ছে দুর্গাপুজো। অন্যদিকে দানা বেধেছে...

    বদলে যাচ্ছে ট্রেনের টাইমটেবিল

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ভারতে দু’কোটি ২৩ লক্ষ মানুষ প্রতি দিন ট্রেনে যাতায়াত করেন। কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য লোকাল,...

    চোখ রাঙাচ্ছে ঘূর্ণাবর্ত , বৃষ্টিতে ভিজবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : চোখ রাঙাচ্ছে ঘূর্ণাবর্ত। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, ওই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে সপ্তমী থেকেই দক্ষিণবঙ্গে বাড়তে পারে...