33 C
Kolkata
Wednesday, August 17, 2022
More

    কৃষ্ণাঙ্গদের হয়ে জেসি ওয়েন্সের প্রতিবাদ বার্লিনের চারটি সোনায় – নির্মলকুমার সাহা

    (‌ ১৯৩৬-‌এ ‘‌হিটলার্স অলিম্পিক’‌-‌কে ‘‌ওয়েন্সেস অলিম্পিক’‌-‌এ পরিণত করেছিলেন জেসি। আজ ১২ সেপ্টেম্বর, জন্মদিনে এই বিশেষ লেখায় অ্যাথলেটিক্সের মহাতারকাকে স্মরণ।)‌

    আমেরিকার জেসি ওয়েন্স এবং জার্মানির লুজ লং। দুজনেই বিখ্যাত লং জাম্পার। ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিকে ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। বার্লিনেই দুজনের প্রথম পরিচয়। যোগ্যতা অর্জনের লাফ শুরু হয়েছে। সোয়েটার গায়ে ওয়ার্ম-‌আপ করছেন ওয়েন্স। একটু আগেই ২০০ মিটারের হিটে দৌড়ে এসেছেন। লং জাম্পের স্টেপিং ঠিক করতে দৌড়ে এসে পিটের সামনে দাঁড়াতেই জাজ লাল পতাকা তুলে দেন। ফাউল!‌ অ্যাডলফ হিটলারের অলিম্পিক বলে কথা!‌ প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না। হতবাক ওয়েন্স দ্বিতীয় লাফটি সত্যি সত্যিই ফাউল করে ফেলেন। আর মাত্র একটি লাফ বাকি। তাহলে কি বিশ্বরেকর্ডের মালিক পারবেন না ফাইনালে পৌঁছতে?‌ এমন সময় ওয়েন্সের পিঠে হাত রাখেন লুজ লং। নিজের রুমাল এগিয়ে দেন ওয়েন্সের হাতে। বলেন, ‘‌টেক-‌অফ বোর্ডের কয়েক ইঞ্চি আগে একটি মার্ক করে রুমালটি রাখো। ওখান থেকে টেক-‌অফ করো।’‌ ওয়েন্স তাই করলেন। আর ফাউল হল না। ফাইনালে পৌঁছলেন ওয়েন্স। পরে ২৬ ফুট সাড়ে ৫ ইঞ্চি (‌৮.‌০৬ মিটার)‌ লাফিয়ে সোনাও জিতলেন। লং পেলেন রুপো (‌৭.‌৮৭ মিটার)‌। কিন্তু সত্যি কি লুজ লং পরামর্শ দিয়েছিলেন ওয়েন্সকে?‌ অলিম্পিকের মতো বড় আসরে এটা কি হতে পারে?‌ বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকার বা লেখায় জেসি ওয়েন্স ওই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। একটি সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনা সম্পর্কে ওয়েন্স বলেছিলেন, ‘‌….I remember most was the friendship I struck up with Lutz Long, the German long jumper. He was my strongest rival, yet it was he who advised me to adjust my run-up in the qualifying round and thereby helped me to win.‌’‌

    ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া একটি তথ্যচিত্রেও (‌Jesse Owens Returns To Berlin)‌ ‌‌‌‌‌‌লুজ লংয়ের পুত্র Kai ‌‌‌‌-‌কেও ওই গল্প শুনিয়েছেন ওয়েন্স। কিন্তু ১৯৬৫ সালে জেসি ওয়েন্সের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সেখানে ওয়েন্স আবার এই ব্যাপারে ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন। বিতর্ক বজায় রেখেই তিনি হেসে বলেছেন, ‘‌সত্যি-‌মিথ্যে জানার দরকার কী?‌ গল্প হিসেবে এটা তো বেশ ভালই।’‌

    শুধু লং জাম্পের নয়, সেবার বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্সের গলায় উঠেছিল চারটি সোনার পদক। বাকি তিনটি ১০০ মিটার (‌১০.‌৩ সেকেন্ড)‌, ২০০ মিটার (‌২০.‌৭ সেকেন্ড)‌ এবং ৪x‌‌‌‌১০০ মিটার রিলের (‌৩৯.‌৮)‌। এরমধ্যে ২০০ মিটার ও ৪x‌‌‌‌১০০ মিটার রিলেতে হয়েছিল বিশ্বরেকর্ড। বার্লিন অলিম্পিক পরিচিত ‘‌হিটলার্স অলিম্পিক’‌ নামে। কিন্তু জেসির ওই সাফল্যের জন্য অনেকে বলেন, ‘‌ওয়েন্সেস অলিম্পিক’। বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্সের ওই চারটি সোনা জয় আসলে ছিল বিশ্বের কালো মানুষদের হয়ে একটি প্রতিবাদও। অনেক উপেক্ষা, অবজ্ঞার জবাব ওই চারটি সোনা।

    ১৯৩৬-‌এর সেই বার্লিন অলিম্পিকে অ্যাডলফ হিটলার খুব উৎসাহী ছিলেন অ্যাথলেটিক্সের দুটি ইভেন্ট নিয়ে। ১০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্প। ওই দুই ইভেন্টে তিনি দুই জার্মান এরিক বোর্চমেয়ার এবং লুজ লং-‌এর গলায় সোনার পদক দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেসি ওয়েন্সের সামনে উড়ে গিয়েছিলেন এরিক। আর লড়ে হেরেছিলেন লং। দ্বিতীয় দিনেই ‘‌নিগ্রো’‌ জেসি ওয়েন্স যখন ১০০ মিটারে সোনা জেতেন হিটলার তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি ওয়েন্সের সঙ্গে করমর্দন করতেও রাজি হননি। তৃতীয় দিন লং জাম্পে ওয়েন্সের আবার সোনা। আবার একই কাণ্ড হিটলারের। কিন্তু হিটলারের চোখের সামনে প্রথমে যিনি ওয়েন্সকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তিনি লুজ লং। পরে লং-‌এর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল ওয়েন্সের। চিঠিতে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বার্লিন অলিম্পিকের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যান লং। তারপরও লংয়ের পরিবারের সঙ্গে যোগযোগ ছিল ওয়েন্সের। লংয়ের ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে জার্মানিতেও গিয়েছিলেন ওয়েন্স।

    লং জাম্পের পরের দিন ২০০ মিটারে ফের সোনা জেসি ওয়েন্সের। কী আর করবেন হিটলার!‌ এক নিগ্রোর পরপর সাফল্য কী করে তিনি আর মেনে নেন!‌ উত্তেজিত হয়ে নিজের আসন থেকে উঠে স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যান।

    কেমন হয়েছিল সেবার ১০০ মিটার দৌড়?‌ প্রতিযোগী ছিলেন ৩০ দেশের ৬৩ জন। ফাইনালের ৬ প্রতিযোগীর ৩ জন ছিলেন আমেরিকার। ওয়েন্সের সঙ্গে রাল্ফ মেটকাফ ও ফ্রাঙ্ক উইকফ। একজন করে হল্যান্ড (‌টিনুস ওসেনডার্প)‌, জার্মানি (‌এরিক বোর্চমেয়ার)‌ এবং সুইডেনের (‌লেনার্ট স্টান্ডবার্গ)‌। ওয়েন্সের পেছনে থেকে রুপো জিতেছিলেন আমেরিকার মেটকাফ (‌১০.‌৪ সেকেন্ড)‌। ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন হল্যান্ডের ওসেনডার্প (‌১০.‌৫ সেকেন্ড)‌। হিটলারের ‘‌ফেবারিট’‌ বোর্চমেয়ার পেয়েছিলেন পঞ্চম স্থান (‌১০.‌৯ সেকেন্ড)‌।

    বার্লিন জয়ের আগে ১৯৩৫ সালের ২৫ মে মিচিগানে ইতিহাস গড়েছিলেন জেসি ওয়েন্স। বিগ টেন চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৫ মিনিটের মধ্যে গড়েছিলেন তিনটি ইভেন্টে নতুন বিশ্বরেকর্ড, ছুঁয়েছিলেন আরেকটি। স্থানীয় সময় ৩টে ১৫ মিনিটে ১০০ গজ দৌড়ে ৯.‌৪ সেকেন্ডে ছুঁয়েছিলেন বিশ্বরেকর্ড। ৩টে ২৫ মিনিটে লং জাম্পে ৮.‌১৩ মিটার লাফিয়ে নতুন বিশ্বরেকর্ড। যা অক্ষত ছিল ২৫ বছর। ৩টে ৩৪ মিনিটে ২২০ গজ দৌড়ে ২০.‌৩ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ড। শেষ বিশ্বরেকর্ডটি বিকেল চারটেয় ২২০ গজ হার্ডলসে। সময় ২২.‌৬ সেকেন্ড। অনেক জায়গায় নতুন বিশ্বরেকর্ডের সংখ্যাটি ৩-‌এর পরিবর্তে ৫ লেখা হয়। ২২০ গজ দৌড় ও ২২০ গজ হার্ডলসের রেকর্ড দুটিকে আলাদা আলাদা করে ২০০ মিটার দৌড় ও ২০০ মিটার হার্ডলসের রেকর্ড হিসেবে দেখিয়ে।

    জেসি ওয়েন্সের জন্ম ১৯১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আমেরিকার আলবামার ডানভিলে এক দরিদ্র পরিবারে। মা-‌বাবার ১০ সন্তানের সবচেয়ে ছোট। শৈশবে ছিলেন রুগ্ন। ছিল শ্বাস নালীর সমস্যা। শিশু বয়স থেকেই সঙ্গী ছিল ব্রঙ্কাইটিস। কয়েকবার তা থেকে জীবন সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন। বাবার নাম হেনরি ক্লিভল্যান্ড ওয়েন্স। মা এমা ফিৎজেরাল্ড। বাবা ছিলেন ঢালাইকার। কিন্তু নিয়মিত কাজ পেতেন না। ফলে তুলো চাষ করে তাঁকে সংসার চালাতে হত। সেই আয়ও ছিল খুব সামান্য। জেসি ওয়েন্সকেও ৭ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে তুলো চাষের কাজে হাত লাগাতে হত। একবার উইভিলস পোকার আক্রমণে সব তুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিবারে আরও দারিদ্র‌্য নেমে আসে। দিন কাটতে থাকে প্রায় না খেয়েই। জমি বিক্রি করে জেসির পরিবার চলে যেতে বাধ্য হয় ক্লিভল্যান্ডে। জেসির বয়স তখন ৯ বছর। ক্লিভল্যান্ডে যাওয়ার পর জেসির কাজ ছিল মুদির জিনিস বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। কিছুদিন জুতো মেরামতির দোকানেও কাজ করেছেন। পরে ছাত্র থাকাকালীন লিফট অপারেটরের কাজও করেছেন। একসময় রাজ্য আইনসভার উর্দি পরা কর্মী ছিলেন।

    পুরো নাম জেমস ক্লিভল্যান্ড ওয়েন্স। পরিবারের লোকেরা জেমস ক্লিভল্যান্ডকে ছোট করে ‘‌J C’‌ ডাকতেন। ক্লিভল্যান্ডে গিয়ে বোল্টন এলেমেন্টারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকার ‘‌J C’ উচ্চারণ শোনা ভুল হওয়ায় স্কুলের খাতায় ‘‌Jesse’‌ লিখে ফেলেন। সেই থেকে ওই নামেই পরিচিত।

    ক্লিভল্যান্ডে গিয়েই জেসি দেখা পান চার্লস বা চার্লি রিলের। ফেয়ারমাউন্ট জুনিয়র স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক হলেও আইরিশ এই ভদ্রলোক ছিলেন অ্যাথলেটিক্স কোচও। জেসিকে দেখে চার্লির মনে হয়েছিল বড় অ্যাথলিট হবে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যই পাশের বোল্টন জুনিয়র হাই স্কুল থেকে নিজের স্কুলে এনে ভর্তি করান জেসিকে। দারিদ্র‌্যের মধ্যেও শুরু হয় জেসির পদক জেতা। পরে লেখাপড়া করেছেন ইস্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুল এবং ওহিও ইউনিভার্সিটিতে।

    শুধুই কি দারিদ্র‌্য?‌ গায়ের রঙ কালো বলে পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়েছে জেসি ওয়েন্সকে। স্কুল বা ইউনিভার্সিটি থেকে কখনও খেলোয়াড় হিসেবে কোনও বৃত্তি পাননি। অথচ ওঁর চেয়ে কম সাফল্য পাওয়া অনেকেই সেই বৃত্তি পেয়েছেন, গায়ের রঙ সাদা হওয়ায়। আরও কত সমস্যা!‌ ওয়েন্স জানিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে একবার এক রেস্তোরাঁয় খেতে ঢুকেছেন। মালিক শ্বেতকায়। সেখানে কালোদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। কর্মীরা খবর দেন মালিককে। তিনি এসে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দেন জেসিকে। বার্লিনের সাফল্যের পর ওই রেস্তোরাঁর মালিকই জেসির সম্মানে ভোজ দিয়েছিলেন!‌ 

    শৈশব থেকে দারিদ্র‌্য ছিল ওয়েন্সের প্রতিদিনের সঙ্গী। ১৯৩৬-‌এ বার্লিন জয় করে ফেরার পর আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দুর্দান্ত সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। নিউইয়র্ক ও ক্লিভল্যান্ডে ওয়েন্সের সম্মানে হয়েছিল ‘‌টিকার টেপ প্যারেড’‌। পাশাপাশি ছিল উপেক্ষাও। সরকার ছিল নীরব!‌ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাননি। তিনি অভিনন্দন জানিয়ে চিঠিও পাঠাননি। বার্লিনে হিটলার হাত না মেলানোয় অবাক হননি ওয়েন্স। যেন ওটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নীরবতা?‌ পরে এক সাক্ষাৎকারে ওয়েন্স বলেছিলেন, ‘‌‌Hitler didn’t snub me-‌-‌it was our president who snubbed me. The president didn’t even send me a telegram.’‌

    উপেক্ষা, অবহেলার শিকার হয়েছেন আরও নানা ভাবে। ‌আমেরিকার অ্যাথলেটিক ইউনিয়নও তখন জেসি ওয়েন্সকে যোগ্য সম্মান দেয়নি। বার্লিন অলিম্পিক থেকে ফেরার পর আমেরিকার অ্যাথলেটিক্স দল সুইডেনে গিয়েছিল একটি আমন্ত্রণী মিটে অংশ নিতে। সুইডেনে যেতে চাননি, এরকম অভিযোগ এনে ওয়েন্সকে সাসপেন্ড করেছিল অ্যাথলেটিক ইউনিয়ন। ওয়েন্স বলেছিলেন, ‘‌আমি যাব না, এটা কবে কাকে বললাম, নিজেই জানি না!‌’‌ প্রতিবছর আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়কে সুলিভান অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। ১৯৩৫ সালে ‘‌ঐতিহাসিক ৪৫ মিনিট’‌-‌এর পর কিংবা ১৯৩৬-‌এ ‘‌হিটলার্স অলিম্পিক’‌-‌কে ‘‌ওয়েন্সেস অলিম্পিক’‌-‌এ পরিণত করেও ওই পুরস্কার পাননি জেসি ওয়েন্স।

    বার্লিন থেকে ফেরার পর‌ কেউ চাকরির কথাও বলেননি। পেট ভরবে কী করে?‌ অর্থকষ্টে নাজেহাল। কী করবেন?‌ অতঃপর নিজেই উপায় বের করলেন। ঠিক করলেন লোক ঠকাবেন। বাজি ধরে দৌড়বেন ঘোড়ার সঙ্গে। মানুষের সঙ্গে ঘোড়ার দৌড়ে কে জিতবে?‌ স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে, ঘোড়াই। কিন্তু জিততেন জেসি ওয়েন্স। নানা জায়গায় ওয়েন্স রেস প্রতি ২০০০ ডলার বাজি ধরে ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়তে শুরু করলেন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯, এইরকম দৌড়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেন ওয়েন্স। প্রতি ক্ষেত্রেই তিনি হার মানাতেন ঘোড়াকে। চতুর ওয়েন্স ওই দৌড় সীমাবদ্ধ রাখতেন ১০০ গজের মধ্যে। কারণ তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন, দূরত্ব আর বেশি হলে কোনওভাবেই পারবেন না। পারা সম্ভব ছিল না। কেন?‌ ঘোড়া-‌মানুষের ওই দৌড় শুরু হত পিস্তল ফায়ার করে। শব্দ শুনে কী করতে হবে, তা ঘোড়ার আগে বুঝতেন ওয়েন্স। তিনি দৌড় শুরু করে দিতেন। কিন্তু পিস্তলের শব্দে ঘোড়া চমকে যেত। পিঠে বসে থাকা মানুষ লাগামের মাধ্যমে ঘোড়াকে নির্দেশ দিতেন দৌড় শুরু করার। ততক্ষণে ওয়েন্স অনেকটাই এগিয়ে যেতেন। শেষ পর্যন্ত জিততেনও।

    ওই ‘‌ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়’‌ তো ছিল সাময়িক। কতদিন আর চলতে পারে মানুষকে বোকা বানানো?‌ ছাত্রজীবনের মতোই তাঁকে বেছে নিতে হয়েছে নানা কাজ। যেমন কখনও গ্যাস ডেলিভেরি সেন্টারে কাজ করেছেন, আবার কখনও এক ড্রাই ক্লিনিং দোকানের ম্যানেজার। একসময় তাঁকে দেখা গিয়েছে এক মাঠের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবেও কাজ করতে।

    অর্থের খোঁজে খেলতে নেমেছিলেন বেসবলও। অবশেষে অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন ঘটে ১৯৪২ সালে। ইউনিভার্সিট অফ মিচিগানের প্রাক্তন অ্যাথলিট উইলিস ওয়ার্ড একসময় ট্র‌্যাকে ওয়েন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে ওয়েন্সকে নিয়ে যান ডেট্রয়টে। পরে অন্যতম ডিরেক্টর হন। তবে বেশিদিন ওখানে ছিলেন না। ১৯৪৬-‌এ ওই চাকরি ছেড়ে দেন। সেটা বেসবলের টানে। নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন বেসবলের এক দলের সঙ্গে। সেখানেও বেশিদিন নয়। আবার শুরু করেছিলেন ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়। এভাবে আজ এটা, কাল ওটা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। ততোদিনে আমেরিকার সরকারের কিছুটা সুনজরে আসেন। কিছুদিনের জন্য সরকার Goodwill ambassador ‌‌‌নিয়োগ করেছিলেন ওয়েন্সকে। কিনেছিলেন রেসের ঘোড়াও। 

    একসময় ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ১৯৭৯-‌র শেষ দিকে শারীরিক অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়ে। পরের বছর মস্কো অলিম্পিক নিয়ে তখন টালমাটাল অবস্থা। আমেরিকা মস্কো অলিম্পিক বয়কট করতে চলেছে। তা নিয়ে বিশ্ব তোলপাড়। আমেরিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল ওয়েন্সের। অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি জিমি কার্টারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, মস্কো অলিম্পিক বয়কট করা ঠিক হবে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ‘‌খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে মেশানো উচিত নয়। অলিম্পিক আদর্শ সবার উপরে।’‌ তাঁর সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। আমেরিকা বয়কট করেছিল ১৯৮০-‌র মস্কো অলিম্পিক। সেটা অবশ্য দেখতে হয়নি ওয়েন্সকে। তার আগেই সেই ‘‌অলিম্পিক ইয়ার’‌-‌এ (‌১৯৮০)‌ ৩১ মার্চ জীবনাবসান হয় জেসি ওয়েন্সের।

    বার্লিন জয়ের পর তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট সৌজন্যমূলক অভিনন্দন বার্তাও পাঠাননি। মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কিন্তু শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‌Perhaps no athlete better symbolized the human struggle against tyranny, poverty and racial bigotry.‌‌’‌

    জন্ম:‌ ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩
    মৃত্যু:‌ ৩১ মার্চ, ১৯৮০

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    নেতাজির চিতাভস্ম দেশে ফেরানো হোক , দাবি নেতাজী কন্যার

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : তার অন্তর্ধান রহস্য কি সমাধান হবে ? সেই বিষয়েই এবার বড় পদক্ষেপের কথা বললেন,...

    ভারতীয় ফুটবলের কালো দিন ! AIFF-কে নির্বাসিত করল FIFA

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ভারতীয় ফুটবলে কালো দিন। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনকে নির্বাসিত করল ফিফা। ফিফার তরফে প্রেস...

    আজ ভারত ছাড়া আর কোন কোন দেশের স্বাধীনতা দিবস ?

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : আজ ১৫ অগাস্ট আমাদের দেশের ৭৬তম স্বাধীনতা দিবস। অনেক আন্দোলন আর প্রাণ বিসর্জনের বিনিময়ে...

    দেশবাসীর গর্বের মুহূর্ত , মহাকাশে উড়ল জাতীয় পতাকা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : কোথাও জলের রঙ হল গেরুয়া-সাদা-সবুজ। ফুটে উঠেছে অশোক চক্র। কোথাও আবার জলপ্রপাতে ফুটে উঠেছে...

    মেয়েরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ , জাতির উদ্দেশ্যে ভাষনে বললেন রাষ্ট্রপতি

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : স্বাধীনতার আগের মুহূর্তের সন্ধেয় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলের দেশের নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।...