15 C
Kolkata
Wednesday, January 19, 2022
More

    ইংলিশ চ্যানেল জয়ে আরতি সাহার ‘অলিম্পিয়ান’ পরিচয়ই যেন হারিয়ে গিয়েছে – নির্মলকুমার সাহা

    (‌আজ ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন, ৮০ বছর পূর্ণ। আবার ৫ দিন পর, ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁর ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার ৬১ বছর পূর্তি। এশিয়ার প্রথম মহিলা ইংলিশ চ্যানেল জয়ী, ভারতের প্রথম মহিলা অলিম্পিয়ান আরতি সাহাকে নিয়ে বিশেষ লেখা।)‌

    ইংলিশ চ্যানেল জয়ী এশিয়ার প্রথম মহিলা। এই পরিচয়ে সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের পাতায় ৬ দশক আগে থেকেই তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। কলকাতায় আছে তাঁর দুটি মূর্তি। তাঁর নামে আছে ছোট একটি রাস্তাও। খেলাধুলোয় দেশের প্রথম মহিলা পদ্মশ্রী। ডাক বিভাগ প্রকাশ করেছে ডাকটিকিটও। এসবই তাঁর ওই ‘এশিয়ার প্রথম মহিলা ইংলিশ চ্যানেল জয়ী’‌ পরিচয়ের জন্য। এই কৃতিত্বের চাপে সাঁতারু আরতি সাহার ‘‌অলিম্পিয়ান’ ‌পরিচয়টা ফিকে হয়ে গিয়েছে। যদিও ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার ৭ বছর আগেই অলিম্পিকের সুইমিং পুলের জলে নামা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তাও আবার মাত্র ১২ বছর বয়সে।

    হাটখোলা ক্লাবে আরতি সাহার মূর্তি উন্মোচন করছেন তাঁর কন্যা অর্চনা গুপ্ত।

    আধুনিক অলিম্পিক শুরু ১৮৯৬ সালে। মহিলাদের খেলাধুলো অলিম্পিকে জায়গা পায় পরের আসর, ১৯০০ সাল থেকে। আর অলিম্পিকে ভারত প্রথম মহিলাদের দল পাঠায় ১৯৫২ সালে, হেলসিঙ্কিতে। ৪ জনের সেই মহিলা দলে ২ জন করে ছিলেন সাঁতারু ও অ্যাথলিট। দুই দলেই ছিলেন একজন করে বাঙালি। সাঁতারে আরতি সাহা, অ্যাথলেটিক্সে নীলিমা ঘোষ। দলের বাকি দুই সদস্যা ছিলেন সাঁতারে ডলি নাজির, অ্যাথলেটিক্সে মেরি ডি’‌সুজা।

    উত্তর কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আরতি। জন্ম ১৯৪০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। মাত্র আড়াই বছর বয়সেই মা মারা যান। বাবা পাঁচুগোপাল সাহা কর্মসূত্রে অধিকাংশ সময়ই থাকতেন কলকাতার বাইরে। তাই ঠাকুর্মা ও কাকার কাছেই বড় হয়েছেন আরতি। ৪ বছর বয়স থেকেই কাকা বিশ্বনাথ সাহার সঙ্গে উত্তর কলকাতার বাড়ির কাছাকাছি গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়া শুরু। এভাবেই সাঁতারের প্রেমে পড়ে যাওয়া। কাকার কাছেই শিখে ফেলা সাঁতার। তখনই জলে আরতির হাত-‌পা ছোঁড়ার ভঙ্গি নজর কাড়ে হাটখোলা ক্লাবের বিজিতেন্দ্র নাথ বসুর। তিনি আরতিকে নিয়ে আসেন হাটখোলা ক্লাবে। পরে আরতিকে প্রশিক্ষণ দেন শচীন নাগ ও যামিনী দাস। মাত্র ৫ বছর বয়সে ১৯৪৬ সাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু। শুধু তাই নয়, গলায় উঠতে থাকে অসংখ্য পদক। রাজ্য সাঁতারের একগুচ্ছ রেকর্ডও চলে যায় আরতির দখলে। সফল জাতীয় পর্যায়ের সব প্রতিযোগিতায়ও। সেখানে বোম্বাইয়ের ডলি নাজিরই ছিলেন আরতির সামনে একমাত্র কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী। টানা এই সাফল্যেই আরতি সুযোগ পেয়ে যান ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ভারতীয় দলে। আরতির বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। হেলসিঙ্কিতে আরতি অংশ নিয়েছিলেন ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে। হিট থেকেই অবশ্য বিদায় নিতে হয়েছিল। হিটে সময় ছিল ৩ মিনিট ৪০.‌৮ সেকেন্ড।

    ততোদিনে দিদিকে দেখে বোন ভারতী সাহাও চলে এসেছেন সাঁতারে। অলিম্পিক থেকে ফেরার পর রাজ্য সাঁতারে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে বোনের কাছে হেরে যান দিদি। তারপর থেকেই আরতি শুধু ব্রেস্টস্ট্রোকেই মনোনিবেশ করেন।

    এবার চোখ ফেলা যাক আরতির ইংলিশ চ্যানেল জয়ে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের ব্রজেন দাস প্রথম বাঙালি হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল পার হন। সেই বছরই প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল জয় করেন মিহির সেন। এই দু’‌জনের সাফল্য প্রচণ্ড নাড়া দেয় আরতিকে। ঠিক করেন, তিনিও ইংলিশ চ্যানেল পার হবেন। নেমে পড়েন প্রস্তুতিতে। জলের প্রস্তুতি তো ছিলই। পাশাপাশি ছিল আর্থিক সমস্যা। দরকার প্রচুর টাকা। কে দেবেন সেই টাকা?‌ একদিন আরতি সরাসরিই হাজির হন মু্খ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। প্রথমে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় অবাকই হয়েছিলেন। সরাসরিই আরতিকে বলেছিলেন, ‘‌তুই পারবি না। কেন কষ্ট করে যাবি?‌’‌ আরতি কিন্তু নাছোড়বান্দা। বলেছিলেন, ‘‌আপনি টাকার ব্যবস্থা করে দিন। আমি কথা দিচ্ছি চ্যানেল পার হয়েই ফিরব।’‌ শেষ পর্যন্ত টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। মিহির সেন ও ব্রজেন দাসের পরামর্শ মতো এখানে প্রস্তুতি পর্ব সেরে ১৯৫৯ সালের জুলাই মাসে ম্যানেজার অরুণ গুপ্তকে (‌পরে এঁর সঙ্গেই বিয়ে হয়)‌ সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ড পাড়ি দেন আরতি। সেখানে চলে এক মাসের প্রস্তুতি। পাইলট বোট দেরিতে আসায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪৫ মিনিট পর ২৭ আগস্ট ইংলিশ চ্যানেলের জলে নামেন বাঙালি মেয়েটি। অত দেরিতে বোট আসায় কর্তৃপক্ষ আরতিকে জলে নামার অনুমতিই দিচ্ছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর রাজি হন। কিন্তু ১৪ ঘণ্টা ১০ মিনিট সাঁতার কেটে ডোভারের কাছাকাছি আসার পরও আরতি ব্যর্থ হন।

    এবার কী করবেন?‌ ঠিক করলেন আবার নামবেন। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে আর একটি দিন পেলেন। ততোদিনে টাকার সমস্যা আরও বেড়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ম্যানেজার অরুণ গুপ্ত। এসব সামলেও চলতে থাকে প্রস্তুতি। আবার চ্যানেল পার হওয়ার জন্য ফ্রান্সের কেপ-‌গ্রিল-‌নেজ থেকে জলে নামেন ১৯৫৯-‌র ২৯ সেপ্টেম্বর। এবার সফল হন ১৬ ঘণ্টা ২০ মিনিট সাঁতার কেটে। এশিয়ার প্রথম মহিলা হিসেবে সিটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আরতি করেন ইংলিশ চ্যানেল জয়।

    চ্যানেল জয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পরের বছরই (‌১৯৬০ সাল)‌ পদ্মশ্রী। ১৯৯৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতায় তারক চ্যাটার্জি লেনের মুখে বসানো হয়েছে তাঁর আবক্ষ মূর্তি। আর গত বছর, ২০১৯ সালে হাটখোলা ক্লাবের শতবর্ষে বসেছে আরতি সাহার আরও একটি মূর্তি (‌একই দিন হাটখোলা ক্লাব প্রাঙ্গনে বসানো হয়েছে এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রথম সোনাজয়ী শচীন নাগের মূর্তিও)‌। আরতি সাহার ছবি সম্বলিত ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৯ সালে। আর ২০০৮ সালে তারক চ্যাটার্জি লেনের একাংশের নাম হয়েছে ‘‌আরতি গুপ্ত সরণি’‌।

    জন্ম:‌ ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪০। কলকাতা।
    মৃত্যু:‌ ২৩ আগস্ট, ১৯৯৪। কলকাতা‌। ‌

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    জঙ্গিদের নিশানায় মোদী ! সতর্ক গোয়েন্দা সংস্থা গুলি

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : আসন্ন প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপর আতঙ্কবাদী হামলার ছক ! এই বিষয়ে...

    বিদুৎ গতিতে নামবে করোনা গ্রাফ ! বলছে SBI-র সমীক্ষা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : করোনার তৃতীয় ঢেউর আশঙ্কা ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। একাধিক সমীক্ষা ও গবেষণায় বলা হচ্ছে, জানুয়ারি...

    বিধি নিষেধের জেরে মিলছে সুফল , দেশে নিম্নমুখী দৈনিক করোনা সংক্রমণ

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : দেশের ৯২ শতাংশই টিকা পেয়েছে। বছরের শুরু থেকে আবার ১৫-১৮ বছর বয়সিদের টিকাদান শুরু...

    রাজ্য জুড়ে শীতের আমেজ , তবে শুক্রবার থেকে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : রাজ্য জুড়ে অনুভূত হচ্ছে হিমেল আমেজ। আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা।...

    প্রয়াত বিশিষ্ট কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথ

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : প্রয়াত বিখ্যাত কার্টুন শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ। ৯৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিখ্যাত...