29 C
Kolkata
Monday, October 3, 2022
More

    সাতশো পাহাড় আর একটি অসম্পূর্ণ গল্প – অনির্বাণ রাও।

    টনিদাকে ধন্যবাদ। টনি দা উৎসাহ আর মনের জোর না বাড়ালে অত্যন্ত সুন্দর একটা ট্রিপ জীবনে অধরাই রয়ে যেত। আসলে দু মাস আগে তৈরি হওয়া একটা পরিকল্পনা যাবার একদিন আগে, আরো নিখুঁত করে বললে দশ ঘন্টা আগে ভেস্তে যেতে বসেছিল যখন টিভি আর সোসাল মিডিয়ার বুক জুড়ে শুধু জাওয়াদের সতর্কীকরণ। আমরা যেদিন যাব ঠিক সেইদিন থেকেই নিম্নচাপ আর সাইক্লোনের দাপট শুরু হবার কথা যার অভিমুখ ওড়িশা হয়ে পশ্চিমবঙ্গ। আর আমাদের যে অফবিট জায়গাটাতে যাবার কথা সেটাও অংশত ওড়িশার কেওনঝড় আর কিছুটা ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূমের হাত ধরাধরি করে রয়েছে। একদম অচেনা গন্তব্য। রাত নটার সময় কনফারেন্স কলে আমরা চারজন যখন দিশেহারা তখন টনি দা আমাদের আশ্বস্ত করেছিল এই বলে যে কিছু বৃষ্টিপাত হলেও জায়গাটাতে ঝড়ের প্রভাব পড়বে না। বিশ্বাস করিনি। কিন্তু কিছুটা উপায়হীন আর নিমরাজি হয়ে জানিয়েছিলাম তাহলে আগামীকাল ” যা থাকে কপালে ” বলে ভোর ছ টা কুড়িতে জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে সওয়ারি হচ্ছি। এখন বলতে বাধা নেই , এই সিদ্ধান্ত আমার জীবনে নেওয়া এক সেরা সিদ্ধান্ত , যা না নিলে জীবন থেকে এক বর্ণময় অধ্যায় অধরা রয়ে যেত।

    এখন ভোরের হাওড়া স্টেশনে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে একটা কড়া চা খেয়ে উনিশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটা লাগলাম, কারণ সকলে আগেভাগেই পৌঁছে কোচের সামনে গুলতানি শুরু করেছে। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন লেগে আছে। আর আমাদের কোচ একদম ইঞ্জিন লাগোয়া- ডি ওয়ান। পৌঁছেই আর এক দফা চা খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম সকলের মন থেকে গতরাতের সাইক্লোন জনিত খবরের রেশ সাইক্লোনের দ্বিগুণ বেগে উড়ে গিয়ে সেখানে জায়গা জুড়ে বসে গেছে নয়া সফরের উন্মাদনা। ট্রেন ছাড়ল ঘড়ির কাঁটা মেনেই আর আমরাও শুরু করলাম আড্ডা। পুরো সফরের পরিকল্পনার চাবি কিন্তু টনিদার হাতেই। তাই তাকে আমরা নানা প্রশ্নবাণে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিলাম। পরিকল্পনা আর সফরের পুরো রুপরেখা না ভেঙে মিটিমিটি হেসে বারবার আমাদের আশ্বস্ত করছিল যে ট্রিপ হবে ফাটাফাটি। আসলে আমরা এবার যাচ্ছি ওড়িশা আর ঝাড়খণ্ডের বর্ডারে হাত ধরাধরি করে থাকা এক যমজ জনপদ কিরিবুরু আর মেঘাতাবুরুর বুকে। সাথে ফাউ সারান্ডার জঙ্গলের সফরের হাতছানি। টনিদার মুখে বহুবার এ জায়গাটার কথা শুনেছি আর জেনেছি প্রকৃতি এখানে সম্পূর্ণ অনাঘ্রাত আর জঙ্গলের ভেতর চুপটি করে লুকিয়ে আছে দুর্দান্ত সব জলপ্রপাত – নদী- পাহাড় আর লালমাটির পথেরা। বহুবার আসার সুবাদে টনি দা এ জায়গাটা চেনে হাতের তালুর মত। আর তার হাত ধরে অনেকেই এ জায়গাটা ঘুরে গেছে বেশ দুর্দান্ত স্মৃতি নিয়ে। তাই এবার আমি, অম্বর, প্রণব আর সিদ্ধার্থ দা সকলে কথা বলে এক অচেনা গন্তব্যকে পাখির চোখ করে ফেলি। আসলে এই জায়গাটা, বই পড়ার সুবাদে জানি, বুদ্ধদেব গুহর বা বিভূতিভূষণের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। সিংভূম লাগোয়া এই শালবন, লোহা আর ম্যাঙ্গানিজ খনিতে ঘেরা লাল মাটির পথ আর জঙ্গলের কথা বুদ্ধদেব গুহর লেখায় বারবার ফুটে উঠেছে। সে ঋজুদার গল্পেই হোক বা অন্য উপন্যাসে। তাই লোহা মোড়া মাইন সিটি কিরিবুরু আর মেঘাতাবুরুর সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে আর উপন্যাসের মন ভোলানো বর্ণনাকে মিলিয়ে নিতে আমরা বোহেমিয়ানার সফরের উদ্দেশ্যে গা ভাসালাম তিনদিনের ছুটিতে। আসলে হিম পড়া ভোর কাছে এলেই শাল সেগুনের ঝড়া পাতাদের চিঠিরা আসতে থাকে মনের ভেতর। বিদ্রোহী মন খুঁজে নিতে চায় মুক্তির আস্বাদ। তাই প্রকৃতির মাঝে নিজেকে সমর্পণ শহর থেকে বহু দুরে।

    শেষ স্টেশনে ট্রেন পৌঁছল সঠিক সময়েই। পৌঁছতেই যেন মনে হল এখানে আছে এক ভালোলাগার গল্প। ছোট্ট স্টেশনের চৌহদ্দি জুড়ে মাথা উঁচু করে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বা শালগাছের ঝাঁক। স্টেশনের নাম বারবিল। বাইরে বসেছে আদিবাসী হাট আর হাঁড়িয়ার জমাট আসর। ছোট প্ল্যাটফর্ম, পড়ে থাকা অলস রেললাইন, স্টেশন মাস্টারের ঘর, আদিবাসী মুখ, বেড় দেওয়া সিমেন্টের বেদি এখানে লোহাচুরের ধুলো মেখে চুপ করে অলস হয়ে পড়ে থাকে এককোনে। আর একমাত্র এই ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেলে স্টেশনটা যেন নিজের হয়ে যায়। আসলে এ ট্রেন জামশেদপুর ছেড়ে সিনি, চাইবাসা, ডাঙ্গোপোশি আর নোয়ামুন্ডির লাল ধুলো ঝেড়ে দুলতে দুলতে যতই এগোতে থাকে- টাঁড়- টিলা ছোট পাহাড়, শান্ত পুকুর, নীল সবুজের একচালার টালি ঘর আর ছোট শালবনগুলোর সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় নিমিষে। ছোটনাগপুর মালভূমির গল্প পড়তে আসা বোহেমিয়ানদের কাছে এই তিনরাতে সফর যেন শুরুতেই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট।

    স্টেশন চত্ত্বরে দাড়িয়ে থাকা দুধসাদা বোলেরোটা দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল। লালমাটি চিরে স্টেশনের ভিড় কাটিয়ে আমরা চলে এলাম ছিমছাম একটা হোটেলে যার অভ্যর্থনা শুরু হল মাসালা কোল্ডড্রিঙ্ক দিয়ে। এরপর চান সেরে গরম গরম লাঞ্চের ব্যবস্থাও ছিল চোখে পড়ার মত। খিদের মুখে গরম ভাত, কড়া সম্বরের অড়হরের ডাল, নরম আলু ভাজা,ফুলকপির রসা, জিরেগুঁড়ো দিয়ে রুই মাছের ঝোল, চাটনি আর পাঁপড় – যেন অমৃত। টনিদার নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় মনে হচ্ছিল বাড়ির খাবারই খাচ্ছি। এরপর আমরা শরীরের ভার এলিয়ে দিলাম বোলেরোর নরম সিটে। গাড়ি এগোল কেওনঝড়ের দিকে। চারিদিকে টিলা পাহাড়ের আবছায়া, লাল ধুলোর পথ আর মালগাড়ির জন্য পড়ে থাকা রেলট্র্যাকের কাটাকুটি দেখতে দেখতে আমরা মেপে নিচ্ছিলাম অজানা ওড়িশাকে। নতুন তৈরি হওয়া কেওনঝড়ের সড়কটিও মসৃণ। কিছুক্ষণ বাদে গাড়ি বাঁদিকে বাঁক নিয়ে প্রবেশ করল এক আদিবাসী গ্রামে। গ্রামের নামটা বেশ। মৃগসিঙা বা স্হানীয়দের উচ্চারণে মৃগিসিঙা। বেশ সাজানো আর পরিস্কার মাটির বাড়িগুলো রঙিন। বিস্তর চাষ হয়েছে দেখলাম সর্ষে আর বাধাকপির। ছাগল আর রঙীন পালকের মুরগির ছড়াছড়ি ছাড়িয়ে আমরা চলে এলাম বৈতরণী নদীর পারে। অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে আমরা সত্যিই প্রথমে হতবাক হয়ে গেছিলাম। এখানে সশব্দে বৈতরণী লোহাপাথরের বুক চিড়ে গর্জের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ দিকে বয়ে চলেছে ছবির মত। আর আবহাওয়াও মনরম। এই পাথরের ওপরেই আমরা দেখলাম রাম সীতা পায়ের ছাপ। কথিত আছে মায়ামৃগ বা মারিচ কে মারার জন্য রামচন্দ্র এই নদীর পার ধরেই তাকে ধাওয়া করে হত্যা করেন। সেই পায়ের ছাপই আজ বিদ্যমান। আর সেই থেকে এ অঞ্চলের নামও মায়ামৃগের নাম অনুসরণ করে মৃগসিঙা। পড়ন্ত বেলায় বর্তমানের ছায়ায় বসে অতীতের পুরাকাহিনী শুনতে দুর্দান্ত লাগছিল। অম্বর, প্রণব, সিদ্ধার্থদারা এই ফাঁকে দেদার ছবি আর সেল্ফি ক্যামেরাবন্দি করে নিচ্ছিল। অসাধারণ এই জায়গাটা ছেড়ে উঠতে মন চাইছিল না। বৈতরণীর কলতান শুনতে শুনতে এই নিস্তব্ধ জায়গাতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু টনিদার তাড়াতে
    উঠতে হল পরবর্তী গন্তব্যে যাবার জন্য। পড়ে আসা শেষবেলার ধুসর রঙ মেখে গাড়ি ঘুরিয়ে এবার পৌছলাম মুর্গামহাদেব মন্দিরের দোরগোড়ায়। তা আগে অবশ্য দেখে নিয়েছি পাহাড় কেটে আকরিক লোহার নিষ্কাশনের খনি। দুর থেকে। আর স্মারক হিসেবে সংগ্রহে নিয়েছি কিছু লোহাপাথরও। মুর্গামহাদেব মন্দিরটিও এক অজানা বিস্ময়। মহাদেব এখানে গুহাবাসি। আর তার পাশেই এক ত্রিস্রোতা দুর্গম ঝর্না নেমে এসেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। বেলা ছোট হওয়ার জন্য চারিদিকে এখন অন্ধকার নেমে এসেছে, আর তা যেন চারপাশের পরিবেশকে আরোও মোহময় করে তুলেছে। অসাধারণ একটা সন্ধ্যা কাটিয়ে এবার আমরা হোটেলমুখি। ঠান্ডাটাও জাঁকিয়ে পড়ছে। ডাইনিংএ কড়া কফি সহযোগে পকোড়া খেতে খেতে কালকের প্রোগ্রাম টা একটু অদলবদল করে দিল টনিদা। কারণ কাল একটু বৃষ্টিপাতের সম্ভবনা আছে। কথায় গল্পে প্রচুর সময় কাটিয়ে রাতে গরম রুটি, ডাল ফ্রাই, স্যালাড আর কষা চিকেন খেয়ে একটু তাড়াতাড়িই বিছানা নিলাম। আজ সকাল থেকেই অনেক ধকল গেছে।

    আজ সকাল সকাল হৈ চৈ। মেঘলা আকাশকে সঙ্গী করে আজ আমরা যাব সারান্ডার জঙ্গল। ব্রেকফাস্ট করতে না করতেই দেখলাম দুফুরের খাবার পরিপাটি করে প্যাকিং হয়ে গাড়ির পেছনে উঠে গেছে। সাথে পর্যাপ্ত জলের বোতল। আর অনুমতি পত্রের কিছু প্রাথমিক কাজ হোটেল থেকেই সারা হল। বাকিটা শুনলাম পাহাড়চুড়োতে মেঘাতাবুরুর ডি এফ ও অফিস থেকে হবে। বেশ একটা অভিযান অভিযান ভাব সকাল থেকেই । ঠান্ডাটাও পড়েছে জমিয়ে। শেষ এক কাপ চা খেয়ে আমরা সকলে গাড়িতে। শহর ছাড়িয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি ধরল পাহাড়ের পথ। আস্তে আস্তে ওপরে উঠতে লাগলাম আমরা মোহময় এক প্রকৃতির হাত ধরে। মাঝে মাঝে গাড়ি থেকে নামা হচ্ছিল ছবি তোলার জন্য আর লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির সাথে আলাপ জমাবার জন্য। প্রায় সাতাশ কিলোমিটার পর গাড়ি দাঁড়াল মেঘাতাবুরুর পাহাড়ের ওপর। এই মেঘাতাবুরু পরিচিতি ” সাতশো পাহাড়ের দেশ” বলে। এখান থেকে বিস্তৃত টিলা পাহাড়ের অনেক রেঞ্জ দৃশ্যমান। তাই তার এই নাম। সব অজানা গল্প আর তথ্যগুলো টনি দা এত সুন্দর ভাবে বলছিল যে পথের জার্নিটা আমরা মালুম পাচ্ছিলাম না। একটু আগে আমরা একটা চেকপোস্ট পার হলাম। সেটা ছিল কিরিবুরু আর মেঘাতাবুরুর বর্ডার। মজার ব্যাপার হল কিরিবুরু ওড়িশাতে হলেও মেঘাতাবুরু হল ঝাড়খণ্ড জেলার মধ্যে। এই পাহাড়ের আনাচে কানাচে আজ আমরা মেঘও জমে থাকতে দেখলাম এই আবহাওয়ার জন্য। এই পরিবেশটা যে কোন সেরা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে যে গুনে গুনে দশ গোল দেবে সেটা কিন্তু মনে মনে বুঝতে পারছিলাম। তাই ভালোলাগা আর উত্তেজনার পারদটা ক্রমশঃ বাড়ছিল। টনি দা বলল যে ভাগ্যে না থাকলে আর লাখ টাকা খরচ করলেওও মেঘাতাবুরুর এই মেঘের খেলা দেখা অনেকের কপালে থাকে না। নিম্নচাপের এই আবহাওয়া আমাদের শাপে বর। যাই হোক আমাদের ড্রাইভার বাবুলা চলে গেছে আমাদের পারমিশনের কাগজ নিয়ে ডি এফ ও অফিসের ভেতর। চমৎকার মজাদার ছেলে এই বাবুলা। মাঝেমাঝেই আমাদের গ্রুপ ছবি তুলে দেয় আর নিজের টিকটক ভিডিও তুলে ওয়ালে পোস্ট করে। মেঘাতাবুরু কিন্তু বেশ সাজানো আর পরিচ্ছন্ন জনপদ। আর পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে সেইল। আমরা এই ফাঁকে কিছু স্ন্যাকস আর ড্রিঙ্কস ও তুলে নিলাম গাড়িতে। কারণ এর পর তিরিশ কিলোমিটার আর কিছুই পাওয়া যাবে না জঙ্গলের ভেতর। টনিদার অনুরোধে নিলাম কিছু চকলেট ও, ভেতরে ট্রাইবাল ভিলেজের বাচ্চাদের দেবার জন্য । বাবুলা ফিরে এলে আমরা মেন গেট এন্ট্রি করে ঢুকে পরলাম সারান্ডার গহীন জঙ্গলের ভেতর।

    জঙ্গলের পথ এবার ঘন আর গম্ভীর হতে শুরু করল। শুনলাম এ পথ নাকি হাতিদের। সেরকম কিছু বিজ্ঞপ্তিও চোখে পড়ল। গাড়ি থেকে নামলাম এই গহীন বনে এক জায়গায়। থমথমে পরিবেশ। এক জায়গায় লেখা দেখলাম -” জঙ্গল যব ভি জ্বলতে হ্যায়, খগ গন সব মরতে হ্যায়।”। টনিদাকে জিজ্ঞাসা করতে বলল এ জঙ্গলে মাঝে মাঝে বিধ্বংসী আগুন লাগে। আর তাতে প্রচুর পাখি আর পশু মারাও যায়। তাই এ জঙ্গলের ভেতর আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ। এই জঙ্গলের যতই গভীরে ঢুকছিলাম অদ্ভুত একটা ভালোবাসা আর মাদকতা জড়িয়ে ধরছিল। আমি অনেক জঙ্গল ঘুরেছি। কিন্তু এটা যেন কোথাও একটু আলাদা। মাইন ব্লাস্টের কারণে নাকি এ জঙ্গলে খুব বেশি বন্যপ্রাণ দেখা যায় না। তাও ঘন শালের বনের এক অদ্ভুত বুনো ,ভেজা গন্ধ যেন এক অদিমতার রেশ দিচ্ছিল। এই জঙ্গল এশিয়ার সব থেকে বড় শালের জঙ্গল। আর এক জায়গায় চোখে এল ছোট্ট অথচ জলে পরিপুষ্ট এক ঝোড়া। শাখা নদীও বলা চলে। টনিদার মুখে শুনলাম এ নাকি হাতিদের জল খাবার জায়গা। সত্যি ই দেখলাম এখানেও এক লেখা – ” মাহিনা হ্যায় শাওন, গজরাজ কি অঙ্গন”।এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার জঙ্গলের পথ। সঙ্গী হল শাল, জারুল, আম, ডুমুর, কেন্দু,কুসুম আর মহুয়া গাছেরা। অনেক গাছ চিনিয়ে দিল টনি দা আর জানাল মার্চ মাসে কচি কুসুম পাতার ধরা লাল রং সমস্ত জঙ্গলে যেন আগুন জ্বালে। এর মধ্যেই আমরা সেন্ট্রাল ফোর্সের দুটি চেকপোস্টে আমাদের অনুমতি পত্র চেক করালাম। দেখলাম তাদের টহলদারিও চলছে। জঙ্গলের আরো গভীরে একসময় শেষ হল রহস্যময় পথ। জঙ্গল এখানে এত গভীর যেন সূর্যের আলোও থমকে যায়। দুরে এক ভাঙা, পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার। মরচে ধরা লোহার নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে অনেক উঁচু থেকে জঙ্গল দেখে আমরা গেলাম এক প্রাকৃতিক গুহা দেখতে। এখানে ভালুকের দল অহরহ আশ্রয় নেয়। দেখে ছমছম করে উঠল গা। এখানে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এলাম থলকোবাদ জঙ্গলের কাছে বনবাংলোতে। আর এখানেই গাড়ির বনেটে শতরঞ্চি পেতে শুরু হল আমাদের বনভোজন। উফফ। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। ফেলে আসা শৈশবের দিন গুলো যেন কোন গোপন পথ বেয়ে আজ আবার মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। দেখলাম সিদ্ধার্থ দা, অম্বর, প্রণব সকলেই নিজের মত করে মুহুর্তগুলোকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। ছবিও তুললাম প্রচুর। এরপর জঙ্গলমহল ছেড়ে ফিরে আসার পালা। বেলাও ছোট হয়ে আসছিল। ফেরার পথে দেখে নিলাম লোহার এক দানব খাদান কে। ওপেন কাস্ট এই খনি থেকে তোলা হয় লোহার আকরিক। এর পর দ্রুত গাড়ি চেকপোস্ট পেরিয়ে থামল মেঘাতাবুরু সানসেট পয়েন্টে। আবহাওয়া কিছুটা পরিস্কার হলেও ঠিক সূর্যাস্তের দৃশ্য আমাদের দেখা হল না ঠিকই তবে পড়ন্ত সুর্যের আলোর যে রোশনাই আর রঙ দেখলাম তা আমাদের জীবন রাঙিয়ে রাখবে বহুদিন। সাথে সাথে জাওয়াদ নামে ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক মন থেকে সরে গিয়ে সে জায়গা পুরোপুরি দখল করে বসে গেছে রোমাঞ্চ আর ভালোলাগা সেটাও বুঝতে পারছিলাম। না হলে মেঘাতাবুরু হিলটপের ক্যান্টিনে কনকনে ঠান্ডাতে নিশ্চিত মনে পরপর দু কাপ কড়া কফি ওড়াতে পারতাম না।

    আজ সকাল হল বেশ ভারী বৃষ্টিকে সঙ্গী করে। যদিও তা ঘন্টাখানেকের মধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হল। আজ আমাদের সেরকম তাড়াহুড়ো নেই। যদিও স্পট আছে বেশ কিছু। আজ আমরাই ঠিক করলাম যে আজও লাঞ্চে হবে প্যাকড। আর তা খাওয়া হবে জঙ্গলের যে কোন জায়গাতে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে আজ জমজমাট খাবার। গরম লুচি, সাদা আলুচচ্চরি আর ওড়িশা ফেমাস ছানাপোড়া। জানলাম এ ছানাপোড়া স্পেশাল আর আসে কটক থেকে। দুপুরে আজ লাঞ্চের মেনু পরোটা আর ডাবল ডিম কশা। এর মধ্যেই টনিদা রাতের মেনুতে মাটনের অর্ডার দেওয়াতে মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে গেল। আমরা এবার জমাট ঠান্ডা আর আর মিহিদানা বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। টনিদার অনুরোধে আজ আমাদের সঙ্গী হল হোটেলের নম্র, ভদ্র আর হাসিখুশি ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার প্রদীপ। সুন্দর আর নির্জন জঙ্গলের পথ পাড়ি দিয়ে, ঠাকুরানির পাহাড়ের পায়ের তলা দিয়ে আমরা পৌছলাম এক রহস্যময় জঙ্গলে। এখানে এক ঝর্ণা ঘিরে আছে এক শিবমন্দিরকে । এ জঙ্গলের নাম জটেশ্বরের জঙ্গল। অনেক গল্প আর লোকগাথা ঘেরা নিশ্চুপ এই জঙ্গল- দেউলে প্রবেশ করলে মন যেন আপনিই ভাল হয়ে যায়। অজানা এক উৎস থেকে এখানে শিবলিঙ্গের মাথায় সারা বছর চব্বিশ ঘন্টা ধরে বিন্দু বিন্দু জলধারা ঝরছে প্রায় পঞ্চাশ ফুট ওপর থেকে। শান্ত পরিবেশ ছেড়ে আমরা জঙ্গলের এক শুঁড়িপথ ধরে আরো গভীরে গিয়ে পৌছলাম এক বিশাল হ্রদের শেষ প্রান্তে। এটি জটেশ্বর লেক। পাশ দিয়ে রাঙামাটির এক পথ গিয়েছে অজানার খোঁজে। জমাট ঠান্ডাতে আমরা সকলে হৈ হৈ করে নেমে পড়লাম দুর্দান্ত এই লেকের পাড়ে, বৃষ্টি মাথায় করেই। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঝিকিরা জলপ্রপাত। প্রদীপ আর টনিদা এখান থেকেই প্ল্যান করে হোটেলে ফোন করে বলে দিল ফ্লাস্কে গরম কফি আর কিছু গ্লাস রেডি করে রাখার জন্য। হোটেলের পাশ দিয়ে গাড়ি যাবার পথে তা তুলে নেওয়া হবে। হবে কফি ব্রেক অ্যাট ঝিকিরা। সত্যি বলছি, যত সময় যাচ্ছে আমাদের এই ট্রিপটা জমজমাট হয়ে উঠেছে কিছু দুর্দান্ত অথচ ছোট্ট ছোট্ট কিছু পরিকল্পনার জন্য। তাই আবহাওয়াও কোন বাধা হচ্ছে না। এর মধ্যেই বাবুলা গাড়ি ঘুরিয়ে, হোটেল ছুঁয়ে আবারো এক জঙ্গলের পথ বেয়ে গাড়ি দাঁড় করানো এক বৃষ্টিভেজা বনের ধারে। এখান থেকে হাঁটা পথ। মায়াবী এক জঙ্গলপথ বেয়ে, কিছুটা চড়াই উঠতেই আমাদের সামনে খুলে গেল যেন স্বর্গের দরজা। দেখলাম অসাধারণ এক জলপ্রপাত। প্রায় সত্তর ফুট ওপর থেকে মিহি দানার জলের গুড়ো পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে নেমে আসছে অবিরাম। এ ঝর্নার নাম ঝিকিরা। এখানে সময় কাটালাম অনেক। তোলা হল প্রচুর ছবি। আর জলের পায়ের তলায় বসে গরম কফিতে চুমুক দেবার স্মৃতি বোধহয় সারা জীবনেও ভোলা যাবে না। স্বপ্নিল মত ঘোর লাগা অবস্থায় চলে গেছিলাম। উঠতেই হল পরবর্তী গন্তব্য ফুলবাড়ি জঙ্গলে যাবার জন্য। কিন্তু একটু পরেই শুরু হল ভারী বৃষ্টি। কিছুটা জঙ্গল মুখি হয়ে এক প্রথমিক বিদ্যালয়ের চালা দেওয়া উঠোনে শতরঞ্চি পাতা হল দুফুরের খাবার আয়োজনে। ড্রাইভার আর টনি দা জানালো এই বৃষ্টিতে জঙ্গলে ঢোকা খুব বিপজ্জনক কারণ পাহাড়ী ঝোরাগুলো জল পেয়ে সাংঘাতিক রূপ ধরবে আর তার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালানো খুব দুষ্কর। তাই আমরা ঠিক করলাম মেঘের রূপ দেখতে আজ আবার পাহাড় চুড়োয় যাব। আবার মেঘাতাবুরু। আমরা যখন হিলটপে পৌছলাম তখন বৃষ্টি কিছুটা ধরেছে। তবে চারিদিকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন ফেটে বের হচ্ছে। আমরা আজ অনেক সময় নিয়ে মন ভরে সব ছবি ক্যামেরা বন্দি করে নেমে এলাম বারবিলে।

    কাল আমাদের চলে যেতে হবে। আবার সেই কর্মব্যস্ততার জগতে। সব যাত্রার একটা ফিরে আসার গল্প থাকে। তবুও কিছু গল্প যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর তাকে সঙ্গী করেই আবার লেখা হয় আর একটা নতুন গল্প। এ সফরে আমাদের অনেক জায়গা দেখা হল না। তাই ফিরে আসার গল্প থেকেই তৈরি হচ্ছিল আর একটা নতুন গল্প। আবার এই অচেনা ওড়িশাত আবার আসার গল্প। তা প্রধান কারণ এই তিন দিনেই ভীষণ ভাবে এ জায়গার প্রেমে পড়ে যাওয়া। আর অসম্পূর্ণ প্রেম কখনো পূর্ণতা পায় না। তাই আমার সাতশো পাহাড়ের গল্প কিন্তু শেষ হয়েও রয়ে গেল অসম্পূর্ণ।

    কলকাতা থেকে যারা এই ট্রিপটা করতে চান , তারা নির্দ্বিধায় ফোন করতে পারেন এই নম্বরে- 8910174069

    Related Posts

    Comments

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    সেরা পছন্দ

    বদলে যাচ্ছে ট্রেনের টাইমটেবিল

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ভারতে দু’কোটি ২৩ লক্ষ মানুষ প্রতি দিন ট্রেনে যাতায়াত করেন। কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য লোকাল,...

    চোখ রাঙাচ্ছে ঘূর্ণাবর্ত , বৃষ্টিতে ভিজবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : চোখ রাঙাচ্ছে ঘূর্ণাবর্ত। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, ওই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে সপ্তমী থেকেই দক্ষিণবঙ্গে বাড়তে পারে...

    খাড়্গে বনাম থারুর , জমজমাট কংগ্রেস সভাপতি পদের লড়াই

    দ্যা ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : সরকারিভাবে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন হয়ে গেল দ্বিমুখী। ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মন্ত্রী কে এন ত্রিপাঠির মনোনয়নপত্র...

    মুস্তাক আলি ট্রফিতে বাংলা দলে বিশ্বকাপজয়ী বোলার দলে নেই অভিজ্ঞ ব্যাটার মনোজ, অনুষ্টুপ

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : ১১ অক্টোবর থেকে শুরু সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফির দল ঘোষণা করল বাংলা। ক্রিকেটে...

    গল্‌ফ মঞ্চে বিশ্বকাপজয়ী কপিল-‌ধোনি

    দ্য ক্যালকাটা মিরর ব্যুরো : গুরগাঁওয়ে আমন্ত্রণীমূলক গল্‌ফের মঞ্চে প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক কপিল দেব ও মহেন্দ্র সিংহ ধোনি।...