Breaking
Friday, September 18, 2026 Kolkata, West Bengal
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো ! ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছোঁয়া
Kolkata

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো ! ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছোঁয়া

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী আরাধনা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, স্থাপত্য, পারিবারিক রীতি আর শহরের ইতিহাস। উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্তবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্য।

✍ Admin · September 18, 2026 · 👁 25 views
The Calcutta Mirror Desk : 

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী আরাধনা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, স্থাপত্য, পারিবারিক রীতি আর শহরের ইতিহাস। উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্তবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্য। কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী আরাধনা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, স্থাপত্য, পারিবারিক রীতি আর শহরের ইতিহাস। উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্তবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্য। ১৭৯৪ সালে জগৎরাম দত্তের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পুজো পেরিয়ে এসেছে ২০০ বছরেরও বেশি সময়। তীর্থের মাটি দিয়ে তৈরি ঠাকুরদালান, মাটির প্রতিমায় আঁকা পোশাক, ক্ষীরের পুতুল বলি, আলু ছাড়া ভোগ—প্রতিটি রীতির মধ্যেই রয়েছে আলাদা গল্প।

হাটখোলা দত্তবাড়ির দুর্গাপুজো কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোগুলির মধ্যে এমন এক ঐতিহ্য, যেখানে প্রায় আড়াই শতাব্দীর ইতিহাস আজও নানা পুরনো রীতির ভিতর দিয়ে বেঁচে আছে। উত্তর কলকাতার নিমতলা স্ট্রিটের এই বাড়িতে ১৭৯৪ সালে জগৎরাম দত্ত দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাটনা শাখার দেওয়ান ছিলেন। তবে দত্ত পরিবারে দুর্গাপুজোর ইতিহাস তারও আগে থেকে চলে আসছিল। পরিবারের বংশপরিচয়ের সূত্র পৌঁছে যায় কান্যকুব্জ, অর্থাৎ বর্তমান কনৌজ পর্যন্ত। পরে পরিবারের একটি শাখা হাওড়ার আন্দুল থেকে কলকাতায় এসে বসতি গড়ে। জগৎরাম দত্তের পূর্বপুরুষ গোবিন্দশরণ দত্তের নামের সঙ্গে প্রাচীন গোবিন্দপুরের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে বলে পরিবারের ঐতিহ্যে উল্লেখ করা হয়।

১৭৮০ সালে গোবিন্দশরণ দত্ত গোবিন্দপুর ছেড়ে হাটখোলা অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। সেই থেকেই এই পরিবারের পরিচয়ের সঙ্গে হাটখোলার নামটি স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জগৎরাম দত্ত ৭৮, নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে প্রাসাদোপম বসতবাড়ি নির্মাণ করেন এবং সেখানেই দুর্গাপুজোর আয়োজন শুরু করেন। এই বাড়ির ঠাকুরদালান শুধু পুজোর স্থান নয়, নিজেই কলকাতার পুরনো স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দু’টি দালান এবং পাঁচটি খিলান নিয়ে তৈরি এই ঠাকুরদালানের নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থানের মাটি। কাশী, দ্বারকা, পুরী এবং হরিদ্বার থেকে নৌকায় করে সেই মাটি গঙ্গার ঘাটে আনা হয়েছিল বলে পরিবারের ইতিহাসে জানা যায়। সেই মাটি দিয়েই তৈরি হয়েছিল ঠাকুরদালান।

এই পুজোর প্রতিমাতেও সাবেক বাংলার নিজস্ব ছাপ স্পষ্ট। প্রতিমায় মঠচৌড়ি আকৃতির চালচিত্র থাকে। চালচিত্রে মাটির অলঙ্করণের পাশাপাশি কৃষ্ণলীলা এবং চণ্ডীর কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়। দেবীকে আলাদা করে কাপড় পরানোর রীতি নেই। শিল্পীরা মাটির প্রতিমার গায়েই রং ও তুলি দিয়ে পোশাকের নকশা এঁকে দেন। সিংহের আকৃতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব—এখানে সিংহকে ঘোটকের আদলে তৈরি করা হয়। উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে পরবর্তী দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় এবং শ্রাবণ মাস থেকেই প্রতিমা নির্মাণের কাজ এগোতে থাকে।

পুজোর আচারেও হাটখোলা দত্তবাড়ির নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। ষষ্ঠীর দিন বেলবরণের মাধ্যমে দেবীকে আবাহন করা হয়। পরিবারের কুলদেবতাদেরও এই পর্বে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। অতীতে পুজো পরিবারের কোনও সদস্যের নামে উৎসর্গ করা হত না; কুলগুরুর নামেই পুজো উৎসর্গ হত এবং তিনিই সমস্ত আচার পরিচালনা করতেন। দত্ত পরিবারের সদস্যরা ব্রাহ্মণ না হওয়ায় পুজোর কোনও কাজ নিজেরা করতে পারতেন না। একসময় বোধন থেকে পুজো পর্যন্ত ১২ জন স্মৃতিতীর্থ পণ্ডিত দুর্গানাম ও চণ্ডীনাম জপ করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা কমেছে এবং পুরনো অনেক নিয়মও বদলেছে।

অষ্টমীর অঞ্জলিতেও রয়েছে আলাদা রীতি। মহানবমীর আগে পরিবারের সদস্যরা অঞ্জলি দেন না। নবমীর দক্ষিণান্ত সম্পন্ন হওয়ার পরেই পরিবারের সকলে অঞ্জলি দেন। সন্ধিপুজোতেও রয়েছে বহু পুরনো প্রথা। এখানে ক্ষীরের পুতুল বলি দেওয়া হয়। তবে পরিবারের কোনও সদস্য সেই বলি দেখতে পারেন না। বলির স্থান কাপড় দিয়ে ঘিরে দেওয়ার পরেই আচার সম্পন্ন করা হয়। অতীতে অষ্টমীর সন্ধিপুজোর পর সধবা মহিলাদের সিঁদুর খেলার প্রচলনও ছিল না। তাঁরা দেবীর সিঁদুর নিয়ে একে অপরের সিঁথিতে পরিয়ে দিতেন।

ভোগের আয়োজনেও ছিল বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য। একসময় পুজোর বহু আগে থেকেই বিশাল উনুন জ্বালিয়ে সারাদিন ধরে মিষ্টি ও নোনতা খাবার তৈরি হত। সেই রান্নায় ব্যবহার করা হত গাওয়া ঘি। এখন পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমে যাওয়ায় চতুর্থীর দিন থেকেই মূল প্রস্তুতি শুরু হয়। জিলিপি, নিমকি, খাজা, গজা, বালুশাই, দরবেশের পাশাপাশি লালমোহন, মুটরি, নারকেলের পুর দেওয়া পেরাকি, পোলাও এবং গোলমরিচ দেওয়া মতিচূড়ও তৈরি হয়। অন্নভোগের পরিবর্তে মিষ্টি ও ভাজা পদই এই পুজোর ভোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রান্নায় আলু ব্যবহারেরও রীতি নেই।

এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বদেশি যুগের স্মৃতিও। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় পরিবারের সদস্যরা অরন্ধন পালন করেছিলেন এবং একে অপরকে রাখি পরিয়েছিলেন। পরিবারের সঙ্গে রমেশচন্দ্র দত্ত, তরু দত্ত এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মা প্রভাবতী বসুর মতো বিশিষ্ট মানুষের সম্পর্কের কথাও জানা যায়। একসময় বিসর্জনের সময় গঙ্গার ঘাট থেকে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতিও ছিল। বিশ্বাস ছিল, সেই পাখি কৈলাসে গিয়ে মহাদেবকে জানাবে—মা আবার ফিরে আসছেন। পরে আইন অনুযায়ী পাখি ওড়ানোর প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে হাটখোলা দত্তবাড়ির বিসর্জনের সবচেয়ে পরিচিত ঐতিহ্য আজও অটুট। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই দশমীর বিসর্জন শেষে পরিবারের সদস্যরা গঙ্গার ঘাট থেকে সেই গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। প্রায় ১৭৯৪ সাল থেকে চলে আসা এই পুজোর ইতিহাসে তাই দেবী আরাধনার সঙ্গে মিশে আছে পরিবার, স্থাপত্য, সংগীত, স্বদেশচেতনা এবং কলকাতার পুরনো শহরজীবনের বহু স্তর।

Topics
A
Admin
Staff Reporter at The Calcutta Mirror. Covering stories that impact Bengal and beyond.